Saturday, June 6, 2026
বাড়িসাহিত্যপ্রয়াত কথাসাহিত্যিক আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর ব্যক্তি ও সৃষ্টি - এম জি মহসীন

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর ব্যক্তি ও সৃষ্টি – এম জি মহসীন

আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীরে সৃষ্টি - এম জি মহসীন

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর
ব্যক্তি ও সৃষ্টি
১৯৫৭– ২০২১

              এম জি মহসীন

কালের বিবর্তনে পৃথিবীর রং ও রূপ বদলায়। বদলে যায় মননশীলতার ধারা। পরিবর্তন হয় মানুষের উপভোগ করবার ধরণ ও ধারণের এবং গ্রহণ করবার মানসিকতার।

নদী কখনও তার ঢেউয়ের প্রবল প্রতাপে পাড় ভেঙে প্রশ্বস্ত করে নেয় আপন গতিপথ, কখনও পলি জমিয়ে সৃষ্টি করে নতুন প্রান্তর। আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর ছিলেন নতুন প্রান্তর সৃষ্টি করা এক আখ্যানকার। শব্দশিল্পের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা এক গাল্পিক। অনেকের কাছে পরিচিত ছিলেন পোস্টকার্ড গল্পকার হিসেবে।  অর্থাৎ একটা সার্থক গল্প তিনি একটা পোস্টকার্ডে লিখে ফেলতে পারতেন অনায়াসে। এটা তাঁর প্রতিভার দারুণ এক অণুষঙ্গ।  লোকসাহিত্যের পরে ছিল অসামান্য দরদ। গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন বিষয় ছিল তাঁর লেখার অন্যতম উপজীব্য। খেটে খাওয়া দিনমজুর, চাষাভুষো, জেলে-মালোদের সংগ্রাম, তাঁতী, কামার, কুমোরদের যাপিত জীবন ছিল তাঁর কলমের শক্তি। সমাজের বিভিন্ন স্তরে সামঞ্জস্যহীনতা এবং গরীব দুঃখী মানুষদের সংগ্রামী জীবন তাঁর সাহিত্যের অলংকার। তাঁর অনুসন্ধিৎসা, নিরীক্ষাপ্রবণতা, মননশীলতা এবং ক্ষুরধার উপস্থাপনা নতুন দিগন্ত স্পর্শ করতে সক্ষম।

কথাসাহিত্যিক আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীরের সাহিত্য সাধনার শুরু সত্তর দশকের মাঝামারি সময়ে। পেশায় ছিলেন ডাক্তার। নেশা বলতে সাহিত্য। খানিকটা রাশভারী ধরণের মানুষ। গুরুগম্ভীর বলা চলে। প্রবল আত্মবিশ্বাসী। নতজানু হয়ে দরবার করার চাইতে কাজটাকেই দিতেন প্রাধান্য। সময়ের মূল্য ছিল তাঁর কাছে খুব বেশি। পাঙ্কচুয়াল। পেশাগত দায়িত্বের বাইরে শুধু পড়া আর লেখা। লেখা আর পড়া। এক অজ পাড়াগাঁয়ে  জন্ম নিয়েও তাই সাহিত্যে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন স্বকীয়তা। নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছেন তাঁর রেখে যাওয়া সৃষ্টির ভেতর। যদিও জীবনটা মসৃণ ছিল না একদম। পথ ছিল বন্ধুর। ঘাত- প্রতিঘাতে পূর্ণ। তা তাঁর বাঙময় সাহিত্যের মতই ঘটনাবহুল।

১৯৫৭ সালে লেখকের জন্ম হয়েছিল যশোর জেলার রাজগঞ্জ থানার মোবারকপুর গ্রামে। পিতা- মরহুম মোকসেদ গাজি, মাতা- মুরহুমা আইমানী বেগম। নিম্নবিত্তের কৃষিনির্ভর পরিবার। চার ভাইবোনের ভেতরে তিনি ছোটজন। পড়ালেখা করাটা তাঁর জন্য ছিল বিলাসিতা। পরিবেশ পুরোটাই প্রতিকূল। অস্বচ্ছল বাবা কষ্ট করে উপরের সন্তানগুলোকে পড়াতে পারলেও ছোটটার ক্ষেত্রে পারছিলেন না। পড়া মানে লড়া। নাছোড়বান্দা ছেলেটাকে পরিবার থামাতে পারেনি। তার উপর আবার সাবজেক্ট হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন বিজ্ঞান। যাকে বলে গোদের উপর বিষফোড়া! কারণ সমাজের বা দেশের ‘একজন ‘ হবার অদম্য বাসনা ছিল প্রকট। চোখে তারুণ্যের স্ফূলিঙ্গ। সেখানে খেলে যায় আলোকোজ্জ্বল স্বপ্নের বিভা। ফলে স্কুল-বাড়ি, কলেজ-বাড়ি, মাঠ-ঘাট খেলার ভেতরেও শুরু করেন সাহিত্য চর্চা। বুকের ভেতরে বাজছিল সৃজনশীলতার দামামা। বাড়ির লাগোয়া বিশাল বাওড়ের তিরতিরে ঢেউ আর দৃষ্টিসিমার ভেতরে বয়ে চলা কপোতাক্ষের নিবিঢ় আহবান শুনেছিলেন। মজলেন তাদের প্রেমে।  কবিতার পাখি দিলো ডাক। চুপিসারে লেখা শুরু করলেন কবিতা। একাকী। নিরবে। কেউ শুনতে পেলে হাসাহাসি করবে। চশমা পরা মানুষগুলোর নাক সিটকানোর আশংকাও আছে। তাই লিখে লিখে স্তুপাকার করা আর মাঝেমধ্যে নিজের লেখা নিজে বের করে পড়ে পড়ে অতৃপ্ত মনকে তৃপ্তি দেয়াই ছিল প্রথম দিককার মূল কাজ। কিন্তু বাতাস একরকম থাকেনি সর্বদা। তার গতি হয়েছে পরিবর্তিত, কমবেশি হয়েছে আর্দ্রতা। ভাবনার পাখি তখন  ডানা ঝাপটাতে চাইল ভেতরে। শিখর ছোঁবার নেশায় ভীরুতার বাঁধন কাটতে শুরু করল একসময়। শুরু হয় ছাপার জন্য পত্র-পত্রিকায় লেখা জমা দেওয়া এবং  লুকিয়ে ছাপিয়ে পত্রিকা অফিসে ধর্ণা দেওয়ার পালা। নিজের ভেতরে রণিত হলো নিজেকে প্রমাণ করার তাগিদ।

এমনও দিন গেছে, সকালে বন্ধুর সঙ্গে দেখা করার কথা বলে বা মোড়ের দোকান থেকে আসছি বলে অভুক্ত অবস্থায় একটা ভাঙ্গাচোরা বাইসাইকেল চালিয়ে মোবারকপুর থেকে ঠাঁই চলে গেছেন যশোরে পত্রিকা অফিসে। পনেরো কিলোমিটারের মত পথ। লেখা ছাপা হবার উত্তেজনা আর এতদূর সাইকেল চালানো ক্লান্ত ঘামসেদ্ধ শরীরটা নিয়ে অফিসে হাজির হয়েছেন অফিস খোলার আগেই । আবার প্রতীক্ষার প্রহর গুণে গুণে একরাশ ব্যর্থতার ব্যথা বুকে নিয়ে সেই সাইকেলেই বিদ্ধস্ত শরীরটা বয়ে নিয়ে ফিরেছেন বাড়ি। তখন পেটে এমন ক্ষিধে যে ইচ্ছা করলে যেন পুরো পৃথিবীটাই খেয়ে ফেলা যায়। তবুও দুরন্ত অভিনেতার মত হাসতে হাসতে ফিরেছেন ঘরে। যেন আশেপাশে কোন বন্ধুর সঙ্গে গল্প করছিলেন এতক্ষণ। কাওকে বুঝতে দেবার উপায় ছিল না যে তিনি এক কবিতার পাখি খুঁজতে গিয়েছিলেন শহরে!

নিজের লেখা ছাপা হোক বা না হোক, লেখা তিনি কখনোই বন্ধ করেননি। জাত শিল্পীর ছেনিতে ধার থাক বা না থাক, ভাষ্কর্য বানানো তার আটকায় না। আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীরের কলম থেমে থাকেনি কখনো। প্রচুর পড়েছেন। নিজের ত্রুটি নিজেই ধরেছেন। চিহ্নিত করবার চেষ্টা করেছেন নিজের লেখার দুর্বলতা । তারপর আজ এ পত্রিকায় ‘কাল ও পত্রিকায় এভাবে বিভিন্ন যায়গায় লেখা দিয়েছেন উৎসাহভরে। ধীরে ধীরে উৎকর্ষ সাধিত হয়েছে। মনের মুকুরে ফুটেছে উদ্দীপনার ফুল।সম্পাদক-প্রকাশকরা এসেছেন এগিয়ে।

সম্ভবত কবি- সাহিত্যিকদের চর্চাটা শুরু হয় আনাড়ি হাতের কবিতা দিয়েই। এখানেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কিন্তু লেখক কবিতায় স্বাচ্ছন্দ বোধ করেননি খুব একটা। মননে জ্বলছিল আখ্যানের বাতি। জ্বালিয়েছেন সেটাই। আলোকিত করেছেন কথাসাহিত্যের বাঙময় জগৎ। যেসব আখ্যানে স্বচক্ষে দেখা প্রান্তিক মানুষগুলোর জীবন প্রতিভাত হয়েছে স্বমহিমায়। আমাদের চারপাশে অবস্থিত দুঃখী মানুষগুলার সিমাহীন দুঃখ দূর্দশার করুণ চিত্রগুলো অবলোকন করার সুযোগ তিনি পেয়েছিলেন গ্রামে বসবাসের কারণেই। তাদের দুর্দশায় ব্যথিত হয়েছেন। আন্দোলিত হয়েছেন। অনুভব করছেন স্বার্থপর  মানুষগুলো কিভাবে এই সমাজটাকে নিজের কেনা হাতিয়ারের মত ব্যবহার করে। সেখানেই তাঁর লেখকস্বত্বা ফুঁসে উঠেছে ভেতরে ভেতরে। লিখেছেন গল্প। লিখেছেন সংলাপ সমৃদ্ধ উপন্যাস। চলমান জীবনকে যেহেতু তিনি তাঁর রচনায় অংকন করতেন, তাই সেসব লেখার চরিত্রদের কথামালায় অনেক সময় আসতে দেখা গেছে আপত্তিকর  সংলাপ। যা নষ্ট সংলাপের আবরণে ধ্রুব সত্যের চর্চা। ধ্বংসমূর্তিকে ধ্বংসস্তুপ থেকে উদ্ধার করে অক্ষয়মূর্তি বানানোর প্রয়াস। দেখাতে চেয়েছেন সাহিত্য শুধু মুচকি হাসিতে অবসর সময় কাটানোর জন্য নয়, পথনির্দেশকও বটে। আর এভাবেই প্রায় ত্রিশ বছরের সাধনায় লেখকের হাতে জন্ম নিয়েছে কালজয়ী হবার যোগ্য বেশকিছু বই। সাথে দুই বাংলার বিভিন্ন পত্র-পাত্রিকা ধারণ করেছে অসংখ্য লেখা। যা রচনার পথে তাঁকে হজম করতে হয়েছে অনেক কষ্ট। আগেই বলেছি লেখকের ব্যক্তিজীবন ছিল সমস্যা জর্জরিত। পেশায় উপ সহকারী ক্লিনিক অফিসার। সরকারি ডাক্তার হবার কারণে জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটেছে কেশবপুর উপজেলার সাতবাড়িয়ায়। মাইকেল মধুসূদনের সাগরদাঁড়ি সহ অন্যান্য এলাকাতেও করেছেন দায়িত্ব পালন। চাকরির শেষ দশকের দিকে নিজের প্রাণাধিক প্রিয় স্ত্রী হন পক্ষাঘাতগ্রস্ত। দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থেকে তিনি মারা গেলে বড় একা হয়ে পড়েন লেখক। খাবার কষ্ট ছিল নৈমিত্তিক বিষয়। কখনো কাজের বুয়া রেখে কাজ করাতেন, কখনো পে ইন গেস্ট হিসেবে খেতেন আশেপাশের বাড়িতে। তবে সেসব ছিল অস্থায়ী। এলাকায় পছন্দমত হোটেল রেস্তোরা না থাকায় অভুক্ত থাকতে হতো কখনো কখনো। এমনও দিন গেছে, ক্ষুধার জ্বালায় হাসপাতাল কোয়ার্টারে একা বসে বসে কেঁদেছেন আর লিখেছেন। চোখের নোনাপানি তখন বেরিয়ে আসত কলম দিয়ে। কোনো কোনো দিন পাওরুটি আর কলা খেয়েই দিয়েছেন কাটিয়ে। তবে কলম থেমে থাকেনি কখনো।

আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীরের স্বরচিত  গ্রন্থভাণ্ডারকে সমৃদ্ধই বলা যাবে। বেশকিছু পান্ডুলিপি অপ্রকাশিত থাকলেও জীবদ্দশায় নয় নয় করে প্রকাশিত হয়েছিল ২৭টা বই। যার নামকরণ দেখলেও তাঁর লেখার উচুঁমান এবং অতল শিল্পবোধের পরিচয় মেলে। যথাক্রমে- চলার পথে/ মৃত্যুর সমুদ্র শেষ/ গল্পে মধুসূদন/ একটু গেলে বুনোপথ/ বালাখানার মেহমান/ রেখ মা দাসেরে মনে/ রজনীগন্ধা বনে ঝড়/ নিষিদ্ধ সৌরভ/ বিনষ্ট সংলাপ/ চির জনম হে/ মাধুরী/ শঙ্খচূড়/ শাওন/ নির্বাচিত গল্প (কোলকাতা)/ তোমাকে ভালবেসে (কোলকাতা)/ ডহুরী/ এস এম, সুলতান- সচল সবাক ইতিহাস/ এস, এম, সুলতান কর্ম ও জীবন/ ব্রাত্যজন/ প্রান্তজন/ মারিয়া/ লোকজন/ কপোতাক্ষী/ শেষকৃত্য/ সুন্দরবনের লোকজীবন/ সুন্দরবনের ক্ষুদ্র নৃ ইত্যাদি। সম্পাদিত পত্র- পত্রিকার সংখ্যাও বেশ স্থুল। যথাক্রমে – ক্ষণিক/ স্মৃতি/ আগন্তক/ শিল্প-সাহিত্য/ ঢাক/ ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী/ মেডিক্যাল জার্ণাল (কুষ্টিয়া) ইত্যাদি। সম্পাদিত গ্রন্থঃ শিল্পী রফিক হুসাইন বিরচিত – বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের ইতিহাস।অনুদিত গ্রন্থঃ (Slective novel of ABUL HOSSAUN JAHANGIR)। এসব রচনায় যথেষ্ট নীরিক্ষাপ্রবণতা দেখা যায়। পাওয়া যায় সমস্যার সূত্র খুঁজে পাওয়া এবং সমাধানের দূরদর্শিতা। গল্প নির্মাণে তার খুব বড় গুণ যেটা ছিল- একটা বড় পরিসরের গল্পকে তিনি পরিণত করতে পারতেন খুব ছোট গল্পে। আরেকটু বললে ক্ষুদ্র বা ন্যানো গল্পে। সমালোচকরা যেটাকে বলেছেন পোস্টকার্ড গল্প। অর্থাৎ বিশাল ক্যানভাসের একটা সার্থক গল্প শিল্পের কুশলতায় তিনি নির্মাণ করে ফেলেছেন এমনভাবে যে, তা একটা পোস্টকার্ডে লিখে ফেলা যায় অনায়াসে। চর্চার জন্য শুধু কল্পনাবিলাস নয়, নেশা ছিল লেখার উপকরণ স্থলে হাজির হওয়া। যেখান থেকে গল্পের প্লট নিতেন তা সরোজমিন অবলোকন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গেছেন সুন্দরবনে। ওঠাবসা করেছেন উপকূলীয় জেলে- মালোদের সাথে। দেখতে চেষ্টা করেছেন তাদের চলমান জীবন।

কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক হলেও তিনি প্রচুর আড্ডাবাজও ছিলেন বৈকি। বলতেন- আড্ডা হলো সাহিত্যের প্রাণ। আড্ডা বিনে সাহিত্য হবে না। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যস্নাত কেশবপুর শিল্প সাহিত্যের আখড়া। সময় পেলেই তিনি নিজের ৮০ সিসি কালো বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আড্ডার সঙ্গি খুঁজতে। হঠাৎ করে হাজির হতেন সমকালিন বন্ধুবর কোনো লেখকের বাড়ি। কেশবপুর এলাকায় যার ভেতরে খন্দকার খসরু পারভেজ, মোতাহার হোসাইন,  অনুপম ইসলাম, মকবুল মাহফুজ, হাসেম আলি ফকির, ইব্রাহিম রেজা, নয়ন বিশ্বাস অন্যতম। এই এলাকায় আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর, খসরু পারভেজ এবং সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন ত্রয়ী যেন ছিলেন পান সুপারিশ মত। একজন ছাড়া আরেকজনের চলে হয়ত কিন্তু মজা, রং, স্বাদ কিছুই আসে না। যাকে বলে হরিহর আত্মা। বাড়ি এবং কর্মএলাকার প্রতিভাবান তরুণদের নিয়ে বসতেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান লেখক হোসেন উদ্দিন হোসেনকে মানতেন আদর্শ হিসেবে। যশোর শহরে নিজের বাড়ি থাকায় এবং স্থানীয় একটা দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক হবার সুবাদে সেখানেও জমত আড্ডা। সাংবাদিক আনন্দ দাসের সাথে আড্ডাটা ছিল অলিখিত নিয়মের মত। মাঝেমধ্যে কবি পদ্মনাভ অধিকারীর নলিনী হোমিও চেম্বারের সাহিত্য আখড়ায়।

যে বইগুলোর নাম উল্লেখ করেছি তার বেশিরভাগ গল্পগ্রন্থ। লেখকজীবনের প্রথম অধ্যায়টা তাঁর কেটেছে গল্প নিয়েই। মাঝামাঝি সময় থেকে বড় পরিসরের লেখাই বেশি চলছিল। বেশকিছু উপন্যাস আমরা পেয়েছি তখন পরপর। যা অবশ্যই সমালোচকদের আলোচনার খোরাক হতে সক্ষম। এসব সৃজনশীল রচনার পাশাপাশি আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর গবেষণাধর্মী লেখাতেও রেখেছেন স্বাক্ষর। নিজ জেলা যশোরের দুই যশস্বীকে নিয়ে করেছেন কাজ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে লিখেছেন ‘গল্পে মধুসূদন’ ও ‘রেখ মা দাসেরে মনে’ শিরোনামের গ্রন্থ। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে লিখেছেন ‘ সচল সবাক ইতিহাস- এস এম সুলতান’ এবং এস এম সুলতান, কর্ম ও জীবন’। কেশবপুরের অন্যতম কৃতী কবি ও মধু গবেষক খন্দকার খসরু পারভেজ, সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন এবং তিনি একত্রে এস এম সুলতানের নড়াইলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছেন কখনো কখনো। জমিয়েছেন আলাপ। চিত্রসম্রাট এস এম সুলতান দুই লেখকেরই বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। মূলত আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর দুই বাংলাতেই তিনি ছিলেন একজন সনামধন্য কথাসাহিত্যিক। কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন যশোরের দৈনিক কল্যাণের সাহিত্য পাতা।

কৃতিত্বের জন্য তিনি বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন। লাভ করেছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সন্মাননা। নিজের বাড়ি লাগোয়া রাজগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। স্কুল এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের ছাত্রকে লেখক হিসেবে বরণ করে ২০০৮ সালে। প্রদান করা হয় সন্মাননা স্মারক। রয়েছে, মাইকেল মধুসূদন সম্মাননা পদক, ব্র্যাক ট্রাস্ট কিশোরী ক্লাব সম্মাননা মোবারকপুর, রংধনু সাহিত্য পুরস্কার ডুমুরিয়া-খুলনা, সুজন সম্মানানা পুরস্কার মণিরামপুর, জীবনানন্দ দাস সম্মাননা কোলকাতা, বঙ্গবন্ধু সাহিত্য পরিষদ সম্মাননা, ঢাকা, ধানসিঁড়ি সম্মননা, ঢাকা ইত্যাদি। এলাকার তরুণদের ভেতরে পাঠের নেশা ধরাতে লেখক তার রাজগঞ্জের নিজ বাড়ীতে প্রতিষ্ঠা করেন একটি ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার। প্রতিষ্ঠা করেন মসজিদ।

ভাবনার রেলগাড়িটা চলছিল এভাবেই। চলতে চলতেই একদিন অনিবার্য কারণে থমকে গিয়েছিল তার ইঞ্জিন। প্রিয়তমা স্ত্রী বিয়োগের পর কিছুটা কেটে গিয়েছিল সুর তাল লয়। এভাবে বিচ্ছিন্ন তালে গেছে কিছুদিন। দুটো পুত্র সন্তানের ছোটজন তখনও বেশ অবুঝ। জীবনের প্রয়োজনে চাকরিজীবনের শেষদিকে এসে গ্রহণ করেন দ্বিতীয় স্ত্রী। এবং এর কিছুদিন পরে নিজেই হয়ে পড়েন অসুস্থ। স্ট্রোকজনিত কারণে হয়ে যান প্যারালাইজড। আর পারেননি উঠে দাঁড়াতে। এর ভেতরেই শেষ হয় চাকরির মেয়াদ। অতঃপর দীর্ঘদিন শয্যাশায়ী থেকেই আলিঙ্গন করেন মৃত্যু নামক অনিবার্য পরিণতিকে। রেখে যান তাঁর ইতিহাস হবার যোগ্য সৃষ্টিগুলো। প্রয়াত কথাসাহিত্যিক আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর
                    ব্যক্তি ও সৃষ্টি
                  ১৯৫৭– ২০২১

                  এম জি মহসীন
(প্রথম অংশের পর)
আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীরের স্বরচিত  গ্রন্থভাণ্ডারকে সমৃদ্ধই বলা যাবে। বেশকিছু পান্ডুলিপি অপ্রকাশিত থাকলেও জীবদ্দশায় নয় নয় করে প্রকাশিত হয়েছিল ২৭টা বই। যার নামকরণ দেখলেও তাঁর লেখার উচুঁমান এবং অতল শিল্পবোধের পরিচয় মেলে। যথাক্রমে- চলার পথে/ মৃত্যুর সমুদ্র শেষ/ গল্পে মধুসূদন/ একটু গেলে বুনোপথ/ বালাখানার মেহমান/ রেখ মা দাসেরে মনে/ রজনীগন্ধা বনে ঝড়/ নিষিদ্ধ সৌরভ/ বিনষ্ট সংলাপ/ চির জনম হে/ মাধুরী/ শঙ্খচূড়/ শাওন/ নির্বাচিত গল্প (কোলকাতা)/ তোমাকে ভালবেসে (কোলকাতা)/ ডহুরী/ এস এম, সুলতান- সচল সবাক ইতিহাস/ এস, এম, সুলতান কর্ম ও জীবন/ ব্রাত্যজন/ প্রান্তজন/ মারিয়া/ লোকজন/ কপোতাক্ষী/ শেষকৃত্য/ সুন্দরবনের লোকজীবন/ সুন্দরবনের ক্ষুদ্র নৃ ইত্যাদি। সম্পাদিত পত্র- পত্রিকার সংখ্যাও বেশ স্থুল। যথাক্রমে – ক্ষণিক/ স্মৃতি/ আগন্তক/ শিল্প-সাহিত্য/ ঢাক/ ছিন্ন পাতায় সাজাই তরণী/ মেডিক্যাল জার্ণাল (কুষ্টিয়া) ইত্যাদি। সম্পাদিত গ্রন্থঃ শিল্পী রফিক হুসাইন বিরচিত – বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের ইতিহাস।অনুদিত গ্রন্থঃ (Slective novel of ABUL HOSSAUN JAHANGIR)। এসব রচনায় যথেষ্ট নীরিক্ষাপ্রবণতা দেখা যায়। পাওয়া যায় সমস্যার সূত্র খুঁজে পাওয়া এবং সমাধানের দূরদর্শিতা। গল্প নির্মাণে তার খুব বড় গুণ যেটা ছিল- একটা বড় পরিসরের গল্পকে তিনি পরিণত করতে পারতেন খুব ছোট গল্পে। আরেকটু বললে ক্ষুদ্র বা ন্যানো গল্পে। সমালোচকরা যেটাকে বলেছেন পোস্টকার্ড গল্প। অর্থাৎ বিশাল ক্যানভাসের একটা সার্থক গল্প শিল্পের কুশলতায় তিনি নির্মাণ করে ফেলেছেন এমনভাবে যে, তা একটা পোস্টকার্ডে লিখে ফেলা যায় অনায়াসে। চর্চার জন্য শুধু কল্পনাবিলাস নয়, নেশা ছিল লেখার উপকরণ স্থলে হাজির হওয়া। যেখান থেকে গল্পের প্লট নিতেন তা সরোজমিন অবলোকন করার যথাসাধ্য চেষ্টা করতেন। অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য গেছেন সুন্দরবনে। ওঠাবসা করেছেন উপকূলীয় জেলে- মালোদের সাথে। দেখতে চেষ্টা করেছেন তাদের চলমান জীবন।

কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক হলেও তিনি প্রচুর আড্ডাবাজও ছিলেন বৈকি। বলতেন- আড্ডা হলো সাহিত্যের প্রাণ। আড্ডা বিনে সাহিত্য হবে না। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যস্নাত কেশবপুর শিল্প সাহিত্যের আখড়া। সময় পেলেই তিনি নিজের ৮০ সিসি কালো বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে পড়তেন আড্ডার সঙ্গি খুঁজতে। হঠাৎ করে হাজির হতেন সমকালিন বন্ধুবর কোনো লেখকের বাড়ি। কেশবপুর এলাকায় যার ভেতরে খন্দকার খসরু পারভেজ, মোতাহার হোসাইন,  অনুপম ইসলাম, মকবুল মাহফুজ, হাসেম আলি ফকির, ইব্রাহিম রেজা, নয়ন বিশ্বাস অন্যতম। এই এলাকায় আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর, খসরু পারভেজ এবং সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন ত্রয়ী যেন ছিলেন পান সুপারিশ মত। একজন ছাড়া আরেকজনের চলে হয়ত কিন্তু মজা, রং, স্বাদ কিছুই আসে না। যাকে বলে হরিহর আত্মা। বাড়ি এবং কর্মএলাকার প্রতিভাবান তরুণদের নিয়ে বসতেন। বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বর্ষীয়ান লেখক হোসেন উদ্দিন হোসেনকে মানতেন আদর্শ হিসেবে। যশোর শহরে নিজের বাড়ি থাকায় এবং স্থানীয় একটা দৈনিকের সাহিত্য সম্পাদক হবার সুবাদে সেখানেও জমত আড্ডা। সাংবাদিক আনন্দ দাসের সাথে আড্ডাটা ছিল অলিখিত নিয়মের মত। মাঝেমধ্যে কবি পদ্মনাভ অধিকারীর নলিনী হোমিও চেম্বারের সাহিত্য আখড়ায়।

যে বইগুলোর নাম উল্লেখ করেছি তার বেশিরভাগ গল্পগ্রন্থ। লেখকজীবনের প্রথম অধ্যায়টা তাঁর কেটেছে গল্প নিয়েই। মাঝামাঝি সময় থেকে বড় পরিসরের লেখাই বেশি চলছিল। বেশকিছু উপন্যাস আমরা পেয়েছি তখন পরপর। যা অবশ্যই সমালোচকদের আলোচনার খোরাক হতে সক্ষম। এসব সৃজনশীল রচনার পাশাপাশি আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর গবেষণাধর্মী লেখাতেও রেখেছেন স্বাক্ষর। নিজ জেলা যশোরের দুই যশস্বীকে নিয়ে করেছেন কাজ। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে নিয়ে লিখেছেন ‘গল্পে মধুসূদন’ ও ‘রেখ মা দাসেরে মনে’ শিরোনামের গ্রন্থ। বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানকে নিয়ে লিখেছেন ‘ সচল সবাক ইতিহাস- এস এম সুলতান’ এবং এস এম সুলতান, কর্ম ও জীবন’। কেশবপুরের অন্যতম কৃতী কবি ও মধু গবেষক খন্দকার খসরু পারভেজ, সাংবাদিক মোতাহার হোসাইন এবং তিনি একত্রে এস এম সুলতানের নড়াইলের বাড়িতে গিয়ে তাঁর সান্নিধ্য লাভ করেছেন কখনো কখনো। জমিয়েছেন আলাপ। চিত্রসম্রাট এস এম সুলতান দুই লেখকেরই বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। মূলত আবুল হুসাইন জাহাঙ্গীর দুই বাংলাতেই তিনি ছিলেন একজন সনামধন্য কথাসাহিত্যিক। কিছুদিন সম্পাদনা করেছেন যশোরের দৈনিক কল্যাণের সাহিত্য পাতা।

কৃতিত্বের জন্য তিনি বিভিন্ন সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবর্ধিত হয়েছেন। লাভ করেছেন বেশ কিছু পুরস্কার ও সন্মাননা। নিজের বাড়ি লাগোয়া রাজগঞ্জ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। স্কুল এবং কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের ছাত্রকে লেখক হিসেবে বরণ করে ২০০৮ সালে। প্রদান করা হয় সন্মাননা স্মারক। রয়েছে, ব্র্যাক ট্রাস্ট কিশোরী ক্

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments