Sunday, May 31, 2026
বাড়িসাহিত্যকবি আবু রাসেল এর জীবন কথা

কবি আবু রাসেল এর জীবন কথা

আবু রাসেল—বাংলা সাহিত্যের একনিষ্ঠ সাধক, বাস্তববাদী মননশীলতার এক দীপ্ত প্রচ্ছদ। ১৯৮৮ সালের ৪ জুন পলিমাটির সুবাসমাখা যশোর জেলার ঐতিহ্যবাহী চৌগাছা উপজেলার জগদীশপুর ইউনিয়নের আড়পাড়া গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মোল্লা পরিবারে তিনি প্রথম আলোর মুখ দেখেন। তাঁর ধমনীতে প্রবহমান এক আদর্শিক ধারা; পিতা মো: মীর হোসেন একজন অবসরপ্রাপ্ত আদর্শ শিক্ষক, যাঁর সুনীতি আর সততার ছায়ায় কেটেছে তাঁর শৈশব, আর মাতা মোছা: নুরজাহান খাতুনের সুকোমল মমতায় বিকশিত হয়েছে তাঁর ভেতরের মানবিক ও সৃজনশীল সত্তা।

​কৈশোরের চঞ্চল দিনগুলোতেই চারপাশের চেনা জগৎ, মানুষের জীবনের আলো-ছায়ার খেলা আবু রাসেলের ভেতরের কবিসত্তাকে জাগিয়ে তোলে। সেই অল্প বয়সেই সাহিত্যের প্রতি এক অবিনশ্বর ভালোবাসা তাঁর হৃদয়ের গহীনে স্থায়ী নীড় গড়ে তোলে। তিনি বিশ্বাস করেন, কেবল বেঁচে থাকার নাম জীবন নয়; একটি সুন্দর, রুচিশীল ও সার্থক আগামী বিনির্মাণে সাহিত্য এবং সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের আত্মার এক অপরিহার্য নিয়ামক। এই সুগভীর জীবনবোধকে বুকে ধারণ করে বাংলা সাহিত্যকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার মহৎ সংকল্প নিয়ে তিনি তাঁর প্রাণের চত্বর যশোরের চৌগাছায় প্রতিষ্ঠা করেন ‘সাহিত্য সমাহার’ নামের একটি সাহিত্য সংগঠন। একই সাথে, নবীন ও প্রবীণ সকল শ্রেণির লেখকদের সুপ্ত প্রতিভা ও সৃষ্টিশীল লেখনীকে পৃথিবীর আলো দেখাতে তিনি পরম যত্নে সম্পাদনা করে চলেছেন অনলাইন পোর্টাল ‘sottoobiram.com’।

​শব্দের কারিগর আবু রাসেলের লেখনীতে আবেগ আর বাস্তবতা হাত ধরাধরি করে চলে।
২০২১ সালে আলোর মুখ দেখে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘বিবর্ণ স্মৃতির ডায়েরি’। এই সংকলনে কবির কলম আরও বেশি পরিপক্ক, জীবনমুখী ও দার্শনিক। সমাজ ও নতুন প্রজন্মের নৈতিক চরিত্র গঠনের এক শাশ্বত আহ্বান জানিয়ে ‘সত্য বলা চাই’ কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“জ্ঞানী গুণী হতে হলে,
পড়ার বিকল্প নাই।
চরিত্রবান হতে হলে,
সত্য বলা চাই।”

ফেলে আসা জীবনের ধূসর পাতা আর স্মৃতিকাতরতার এক জীবন্ত দলিল ফুটে ওঠে তাঁর ‘স্মৃতির ডায়েরি’ কবিতায়, যেখানে তাঁর সুগভীর উপলব্ধি—
“ডায়েরিতে লেখা ছিল,
দুঃখ সুখের কল্পনাতে আঁকা-
কালো আঁধার জ্যোৎস্না রাতের বর্ণালী ইতিহাস।”

আর চলতি পথের বিচ্ছেদ ও বুকের ভেতরের তীব্র দহনকে ‘ফেলে আসা স্মৃতি’ কবিতায় তিনি প্রকাশ করেছেন এক বুক হাহাকার —
“চলতি পথে ছিন্ন মিলন,
স্মৃতিটুকুই জন্ম দিল,
হৃদয়কে করল ক্ষত-বিক্ষত।”

সৃষ্টির অমোঘ নিয়মে ২০২২ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘সুখ রঙের স্বপ্ন’। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতায় কবি জীবনের সূক্ষ্ম অনুভূতিগুলোকে অত্যন্ত সহজ অথচ আধুনিক ও গভীর আবেগ দিয়ে সাজিয়েছেন। সম্পর্কের টানাপোড়েন আর তীব্র ভালোবাসার এক অনন্য সমীকরণ প্রকাশ পেয়েছে তাঁর ‘ভুল করছি না’ কবিতায়, যেখানে তিনি লিখেছেন—
“তোমাকে ক্ষমা করব ঠিকই;
মাঝে একটা কমা বসিয়ে,
দাঁড়ি দিলে তো সম্পর্কটা হালকা হয়ে যাবে বলো?”

মানুষের বুকের ভেতরের জমানো বিষাদকে প্রকৃতির ক্যানভাসে এঁকে ‘বৃষ্টি নামের দুঃখ ঝরে’ কবিতায় তাঁর আবেগঘন উচ্চারণ—
“স্বচ্ছ আকাশ পানে চেয়ে ভুলেই গিয়েছিলাম, এইতো সেই আকাশ!
যে আকাশে অজস্র মেঘ জমে,
আকাশের অসীম বক্ষে ঠাঁই না পেয়ে,
কিছু মেঘ বৃষ্টি নামের দুঃখ হয়ে ঝরে।”

শুধু প্রেমের কোমলতা নয়, সমাজের ভণ্ডামি আর শোষণের বিরুদ্ধে তাঁর কলম গর্জে উঠেছে ‘দুই নম্বর’ কবিতায়, যেখানে তিনি অবলীলায় বলেন—
“ইমানকে করেছে দুর্বল,
উপাসনাকে করেছে সবল।
ধর্মের দোহায় দিয়ে কেটেছে গরীবের পকেট, মিটিয়েছে নেতৃত্বের ব্যয়।”

​নিজের একক সৃষ্টির গণ্ডি পেরিয়ে অন্যান্য প্রতিভাকে এক সুতোয় গাঁথার উদার মানসিকতা থেকে ২০২৩ সালে তিনি পরম মায়ায় সম্পাদনা করেন যৌথ কাব্যগ্রন্থ ‘কবিতা সমাহার’।
​আবু রাসেল কেবল একজন কবি নন, তিনি একজন খাঁটি জীবন-পথিক। জীবনের চড়াই-উতরাই থেকে অর্জিত প্রতিটা ক্ষত আর অভিজ্ঞতাকে তিনি বানিয়েছেন তাঁর পথ চলার পাথেয়। আর তাই, জীবন নামের প্রতিটি মঞ্চে তাঁর কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত হয় এক গভীর আশাবাদী বাণী— “হতাশা নয় প্রত্যাশার প্রতিচ্ছবি হয়ে বাঁচতে হবে।”

মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং আত্মিক জাগরণের তাগিদে তিনি আরও এক অমোঘ সত্য প্রকাশ করেন—
“জীবনে উত্থান পতন না থাকলে,
মানুষ চেনা যায় না।
মানুষ চিনতে না পারলে,
প্রকৃত মানুষ হওয়া যায় না। “

সহজ, সাধারণ অথচ গভীর শ্রুতিমধুর এই আধুনিক জীবনবোধের কবি তাঁর অনন্য শব্দশৈলী ও নিরলস সাহিত্য-সাধনার মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের আঙিনায় এবং পাঠকের হৃদয়ে এক শাশ্বত ও অমর আসন তৈরি করে নিচ্ছেন।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments