Saturday, June 6, 2026
বাড়িসাহিত্যকুন্তল কাহন | কবি ও কথাসাহিত্যিক আবুজার |

কুন্তল কাহন | কবি ও কথাসাহিত্যিক আবুজার |

কুন্তল কাহন

অদ্যাপি আমার কর্তৃক তাহারা মুক্তি লাভ করিল, যাহাদেরকে আমি দীর্ঘ ১৮ মাস যাবৎ জ্বালাইয়াছি!
এই পরিত্রাণ লাভে নিশ্চয়ই তাহারা খুশি হইবে, আগত গ্রীষ্মের তাপদাহে আমাকে দেখিয়া তাহাদের শরীর নিশ্চয়ই চিটপিট করিয়া দ্বিগুণে আর জ্বলিবে না!

প্রায় বছর দেড়েক পূর্বে আমার মাথার চুল কাটিয়া ছিলাম, কি অদ্ভুত এক অভিলাষ অঙ্কুরিত হইলো মন মাঝারে, চুল বড় রাখিতে আরম্ভ করিলাম। ধীরে ধীরে বড় হইতে হইতে কিশোরী মেয়েটির মত কাঁধ ছাড়াইয়া আরও কয়েক ইঞ্চি বর্ধিত হইলো। এই অবধি তাহাকে প্রশ্রয় দিইয়াছিলাম অপার স্বাধীনতার সহিত, আজ ইহাকে কর্তন করিলাম দীর্ঘ ১৮ টা মাস পরে!
আমার চুল যাহারা সচক্ষে দেখিয়াছেন তাহারা তো জানেন কতটুকু লম্বা আর ঘন ছিলো। তো এই চুল বড় রাখিবার কারণে বিশেষ কিছু অভিজ্ঞতা সঞ্চার করিলাম বটে। তাহার কিয়দাংশ না বলিলেই নই।
তখন হয়তোবা আমার চুলের বয়স ষান্মাসিক কিংবা সপ্ত কি অষ্ট মাস অতিক্রম করিয়াছে, তবুও চুল কাটিতেছি না, কর্ণের অর্ধভাগ আচ্ছাদিত হইয়াছে, পিছনে গ্রীবাদেশে ফরাশের মত বিছায়াছে তিমির কুন্তলে। গতবছরের ফাল্গুন কি চৈত্র মাস যেন, ধীরে ধীরে মানুষের নজরে বিদ্ধ হইতে আরম্ভ করিল।
কেহ কেহ বলিল_
🗣️কি রে চুল কি ফোকরে মতে রাখা শুরু করেছিস?
🗣️কি ব্যাপার খুকা, চুল এত বড় বড় রেখেছো কেন?
🗣️বাপ, তোমার ভালোর জন্যি বলছি, চুল কেটে ফেলাইও, মানুষ মন্দ কই, তুমি একটা ভদ্র শিক্ষিত ছেলে হয়ে বাইগের দের বেশ ধরবা কেন?
🗣️কোন বাবার দরবারে মুরিদ হইছিস?
👩‍💼 প্রতিবেশি এক ভাবী বলিল, এই বিয়াদব, এত বড় চুল রাখিছিস কেন বাইগেরদের মত?
আমি বিস্ময়াভিভূত হইয়া গেলাম, চুল বড় রাখার কারণে বেয়াদবে পরিণত কবে হইলাম…?
কেহ কেহ আবার মশকরা করিয়া বলিত_
🗣️ এইতো আমাদের মাঝে বিশিষ্ট কবি চলে এসেছে।
🗣️ কবি কবি চেহারা, সাহিত্যিক সাহিত্যিক ভাব, কাঁধে ঝুলা কই?
🗣️ আরে কবি নজরুল যে…
🗣️ ভাই চুল বড় রেখেছেন দাড়ি আরেকটু বড় করলে আপনাকে বেশ্যেকবির মত লাগতো!

তো এভাবেই দিনগুলো কাটিতে ছিলো মানুষের কটুকথা শ্রবণ করিবার নিমিত্তে। কোন রক্ষণশীল পরিবারের নববধূ একাকী বাহিরে গমন করিলে সদা সঙ্কোচ ও ভীতামনে পদযুগলে নিঃশব্দে যেভাবে হাঁটিয়া চলে তেমনি একটা রক্ষণশীল ভঙ্গি আমিও ধারণ করিতাম গ্রামের পথে কোন প্রয়োজনে বাহির হইলে!
এলাকার গন্ডি পেরুলে আপনাকে স্বাধীন সত্তায় উপভোগ করিবার ফুরসৎ পাইতাম। বিশেষ করিয়া কলেজে গেলে বন্ধুমহলের আড্ডায় এমনকি শিক্ষক মহোদয়ের নিকটে বাড়তি সমীহ কপালে জুটিত। স্নাতক শেষ বর্ষের পরীক্ষা সমাপ্ত করিলাম বড়বড় চুলে। আমার চুল এমনকি একই বেঞ্চে বসা ইংরেজি বিভাগের ললিতার সহিত একপ্রকার প্রতিযোগীতায় নামাইয়া দিইয়াছিল বন্ধু আশরাফুল। ঠিক নামটা মনে নাই তাহার, তবে স্বাধীনচেতা ওই মেয়েটি শহুরে বেশে মেয়েদের মত সাজসজ্জায় সজ্জিত হইয়া পরীক্ষা দিইতে আসিত। কয়েকটি বেঞ্চের মধ্যে তাহার দিকেই দৃষ্টিপাত করিত অনেকেই। আমার পিছনে বসিয়া আশরাফুল একটু বেশিই উপদ্রবে লিপ্ত হইতো, কোনমতে একটা চুল তাহার বেঞ্চে পড়িল তো সুযোগটা সে লুফে নিলো।
বলিত, তোদের দু’জনের চুল ঢেকে রাখবি, আমার খাতায় উড়ে আসে বারবার।
সে যেন তাহা গায়ে মাখিত না, যেন কিছুই শুনেনি এমনি করিয়া পরীক্ষা দিইতো। ললিতার বাড়ি মনিরামপুর, এজন্যই তাহার ওপর বিশেষ দৃষ্টি ছিল সঙ্গত কারণে।
তো পরীক্ষা শেষ হইলে শুরু হইলো ভাইভার প্রস্তুতি, বন্ধুরা বলিতে লাগিল, দোস্ত এতবড় চুল রেখে পরীক্ষা দিবি তুই? একটা ফর্মালিটির ব্যাপার আছে না…?
ওইদিন ভাইভার প্রস্তুতির জন্য কলেজে গিয়েছিলাম পাঞ্জাবি পরিধান করিয়া।
স্যারদের বলিলাম, স্যার আমার কি চুল কাটতে হবে?
জাকির স্যার একটু জোরেস্বরে জবাব দিলো, “তুই যেই বেশে আছিস ওভাবেই পরীক্ষা দিবি। এই কয়েক বছরের মধ্যে একমাত্র তোকেই পেলাম বাংলার ছাত্র হিসেবে। বাংলার ছাত্রদের একটা বৈশিষ্ট্য আছে যা তোর মধ্যে আছে, পারলে চুল আরো বড় কর…!”
“একেতো নাচুনে বুড়ি, সাথে যদি পাই ঢোলের বাড়ি” আমিতো বন্ধুদের মাঝে একটা বিজয়ী বেশে উপস্থিত হইলাম; জানিস, স্যার আমাকে এই কথাগুলো বলেছে।

ভাইভার দিনক্ষণ নির্ধারিত হইলো, যথারীতি দায়িত্ব পালনের নিমিত্তে অগ্রভাগে ফর্মাল ড্রেসে উপস্থিত হইলাম মনঃক্ষুণ্নতার সহিত। মনকষ্টের কারণ, আমার প্যান্টটা বেশ ঢিলেঢালা হইয়া গেছিলো, শার্ট ইন করিয়া পরিধানের পরে বেল্ট কোমরে বাঁধিলাম। আমার ভাতিজা সাদিয়া আমাকে দেখিয়া অট্টহাসিতে মাতিয়া উঠিল। এই তনু দেহে এধরণের পোশাকে আমাকে যে বেমানান লাগিতেছে তাহা বুঝিতে আর বেগ পাইতে হইলো না। তাহার ওপর আবার বাবরি চুল!
ভাইভার আগের দিন রাত্রে “বনলতাকে” ফোন করে বলিলাম, ও আমাকে প্রচন্ডভাবে আশ্বস্ত করিল। ছবি পাঠাইলাম, ও বলিল ” কই, আপনাকে তো বেশ সুন্দরই লাগছে, অকারণে কেন মন খারাপ করছেন?”
তুমি আমাকে শান্ত্বনা দেয়ার জন্য এসব বলছো তাইনা?
ও অভিমানের স্বরে বলিল, “আমি বলছি আপনাকে মানাচ্ছে, এটাকে আপনি শান্ত্বনা হিসেবে দেখলেন?”
কোমলস্বরে ধীরে ধীরে বলিলাম, তুমি যখন বলছো সেখানে হাজারটা লোক হাসাহাসি করলেও আমার কিছু আসে যায় না। সত্যিই আমাকে খারাপ লাগছে না তো?
“আরে না, আর কোন বান্ধবীকে পটানোর মতলব আছে নাকি?”
কি বলো তুমি, তুমি থাকতে আমি কি কারোর দিকে তাকাতে পারি? আর তুমি কিন্তু আগামীকাল আমার সাথে সকালেই দেখা করবা, নইলে কিন্তু আমি ভয়ে ভয়ে থাকবো ভাইভার টেনশনে।
“আচ্ছা ঠিক আছে, আর চুলগুলো ভালোকরে আঁচড়িয়ে আসবেন, যেন খোঁপা কইরেন না আবার।”
আচ্ছা তুমি ঠিকঠাক করে দিও কাল সকালে।
“ধুর বদ বেডা!”
বনলতার সাথে অনেক আগে পরিচয় হইলেও দেখা হইয়াছিল আমাদের স্নাতকদের বিদায় অনুষ্ঠানের দিনে। তারপর ধীরে ধীরে আরো ঘনিষ্ঠতা। প্রথম প্রথম ও আমার চুল দেখিয়া বেশ উৎসাহব্যঞ্জক কথা শুনাইতো, তাহার বেশ ভালোই লাগিত আমার অমন চুল রাখিবার ধরণটা। যখন চুল আরো বড় হইলো এবং আমি প্রায়শই খোঁপা বাঁধিতাম ও এই বিষয়টা অস্বস্তিতে প্রকাশ করিত এবং আমার নিকটতম বন্ধু ভং মাস্টারের সহিত সুর মিলাইয়া জোরপূর্বক চুল কাটিয়া দিইতে চাইতো। তাহার পছন্দ মধ্যমা বাবড়ি চুল।
শেষমেশ ভাইভা দিলাম, বাগেরহাট পিসি কলেজের স্যার আর আমাদের বিভাগীয় প্রধান জনাব বিকাশ স্যার আমার ভাইভা নিয়েছিলেন। চুল বড় রাখার বৃত্তান্ত জানার আগ্রহ পোষণ করিলেন, সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেয়ার পূর্বেই সাকিব স্যার শুনাইয়া দিলেন, আবুজার বেশ ভালো লেখালেখি করে। বিকাশ স্যার আমাকে আবৃত্তি করিতে বলিলেন নিজের লেখা একটা কবিতা, শুনাইলাম। পিসি কলেজের স্যার চৌগাছা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করিলেন, বলিলাম। জাকির স্যারের বাড়ি চৌগাছায় হওয়ায় তিনি আরেকটু যোগ করিলেন আমার বলার সুবাদে। সব বন্ধুদের একাডেমিক বিষয়ে প্রশ্ন করিলেও চুলের কারণে আমার ভাইভা হইয়াছিল ভিন্ন ধারায়।

ইহার পরে চুল বড় রাখা কোন হেতুতে সে সম্পর্কে কেউ যখন মিনতির স্বরে জানিতে চাইতো তখন আমিও আমার ব্যক্তিগত অভিলাষ প্রদান করিতাম এভাবে, “ভবিষ্যতে আর কখনো বড় চুল রাখার সুযোগ হবে কিনা জানিনা, চাকরি বাকরি করলে তো আর বড় চুল রাখা সম্ভব না, আর বুড়ো বয়সে তো মাথা টাক হওয়ার পর্যায় থাকে। তাই এখন কোন বাঁধা নেই চুল রাখতে, এজন্য রেখে দিয়েছি। ভবিষ্যতে যেন নাতিপুতিদের দেখাতে পারি আমার বড় চুলের ছবি। মূলত শখের বসত রেখে দেয়া বড় চুল।”
অনেকের ধারণা হইয়াছিল, আমি হয়তোবা কোন মানসা করিয়াছি, কেউবা ভাবিত ছ্যাঁকা খাইয়াছি, কাহারো ভাবনা ছিলো কোন বিশেষ গোষ্ঠীর মতাদর্শ গ্রহণ করিয়াছি।
প্রথমদিকে চুল যখন বড় হইতেছিল তখন মহল্লার কিছু বয়সী আর বয়সিনী বলিত, চুল কাটছিসনে কেন? তোর কি চুল কাটার টাকা নেই? আমার থেকে নিয়ে চুল কেটে আসিস। একগাল হাসিতে অব্যক্ত জবাব দিইতাম। কুন্তল যখন ঘাড় অবধি নিম্নগামী, কেউ তখন চুল কাটিবার প্রসঙ্গ তুলিলেই মুহূর্তেই উত্তর দিইতাম, টাকা নেই চুল কাটার, কিছু টাকা দিয়েন তো!
ঘুরাঘুরি করার নেশাটা আমার ধমনিতে প্রবাহমান, আর বিগত বৎসরে অন্যান্যবারের তুলনায় একটু বেশিই ভ্রমণবিলাসের ফুরসৎ হইয়াছে। কিছুটা ভ্লগ করাও শিখিয়াছি, যতগুলো ভ্লগ আছে অদ্যাপি সেক্ষেত্রে ভিডিওতে আমার লম্বাচুলের আধিক্য লক্ষ্যণীয়। নীলফামারি, দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার জেলায় ভ্রমণ করিয়াছি এই লম্বা চুল রাখিয়াই। আশার জায়গা, ভবিষ্যত বড় চুল রাখিবার সুযোগ না মিলিলেও উক্ত জেলা ভ্রমণের ভিডিওতে আপনার চুল দেখিয়া স্মৃতির ঘ্রাণ লইতে পারিব।

স্নাতকোত্তরে ভর্তি হইলাম সরকারি মাইকেল মধুসূদন কলেজে। পরিচিত ক্যাম্পাস হলেও নবীন বটে, বিভাগীয় শিক্ষক মহোদয়েরা সম্পূর্ণ অপরিচিত। নয়া নয়া বন্ধু-বান্ধবদের সবাই আমার এই দীর্ঘ কুন্তলেই দেখিলো। অর্থাৎ তাহারা আবুজার বলিতে লম্বাচুলের ঘ্যানা পাতলা লম্বা ছেলেটাকেই অনুধাবন করিতে পারে।
রমজানের ছুটিতে আছি বন্ধুমহলের সবাই। চুল কাটিয়াছি ইহা তাহাদিগকে অবগত করাই নাই এখনো। ঈদের পরে যখন তাহারা আমাকে দেখিবে তখন বিস্ময়াভিভূত হবে নিশ্চয়। কেননা তাহারা আমাকে ছোট চুলে ইতোপূর্বে দেখে নাই।

এবার আমার চুল রাখা নিয়ে কিছু পক্ষপাত ও বিপক্ষের বিরূপ চাহনি সম্পর্কে দু’চারটে কথা বলি। আমাদের মসজিদের ইমাম সাহেব আমাকে যথার্থই সমীহ করেন বটে। আমাকে কখনোই কিছু বলেননি তিনি, কিন্তু বন্ধু সাদ্দামের সঙ্গে আলাপ করিয়াছেন বেশ কয়েকবার। আমি এরূপ বেশ ধরিয়াছি কেন তা তিনি ভাবিতে পারিতেছেন না। আমার আব্বাকেও বলিয়াছেন আমি কেন এ বেশ ধরিয়াছি? চুলে খোঁপা করার বিষয়টা লুকায়িত রাখিয়াও তাহার দৃষ্টির অগোচর করিতে ব্যর্থ হইয়াছি। পাড়ার এক বড় ভাই কৃষিক্ষেতে আমার আব্বাকে বলিয়াছিলেন, চাচা আপনার ছেলে আবুজার কি হয়ে গেলো, মানুষজন নিন্দা করছে!
বাড়ির মানুষের দুটো কথা না বলিলেই নহে। বড় ভাই তো মানিয়াই নেননি, মা’কে অভিযোগ জানাইয়া ছিলেন সেই শুরুতে। বড় ভাবী গভীররাতে তাহার সেলাই মেশিনের কাইচি দ্বারা চুল কাটিয়া দিইবার হুমকি দিইয়াছেন। মেজভাই রাগ দেখাইতো চুল এলোমেলো করে রাখি তাই, চুল কেন হলদে রূপ ধারণ করিল, কালো কেন করি না, চুল যত্নে রাখিতে না পারিলে রাখার দরকার নাই ইত্যাকার কথা শুনাইতো। কারণ আমার জন্য তাহার বন্ধুমহলেও হয়তোবা দু’চারটা কথা শুনিতে হইতো।
কিন্তু আমার আব্বা বরাবরই আমার চুলের ব্যাপারে আগ্রহ দেখাইতো, বিভিন্ন পরামর্শ দিইতো, লোকে কি কথা বলিল আমার সম্পর্কে তাহা বাড়িতে আসিয়া আমাকে ও মা’কে কাব্যিকভাবে শুনাইতো। কারণ তিনিও একসময় কবি নজরুলের মত ঝাকড়া বাবড়ি চুল রাখিয়াছিলেন। এবং তাঁহার দাবী আমার থেকেও তাঁহার চুল বেশি সুন্দর, ঘন ও লম্বা এবং কালো কুচকুচে ছিলো।
সবচাইতে বেশি ভালো লাগিত মা যখন তাঁহার আপন হস্তে আমার মাথায় তৈল মাখাইয়া দিইতো, চিরুনি দ্বারা মাথা আঁচড়াইয়া দিইতো, এমনকি তাঁহার কুন্তল কালো করিবার শ্যাম্পু আমার চুলের অগ্রভাগে মাখাইয়া দিইতো। আমার মেজ বোন, সেজ বোন তাহারও আমার মাথায় তৈল দিইয়া চুল আঁচড়াইয়া দিইয়াছেন। কিন্তু বড়বোন শুধু বকাঝকা দিয়েই তাহার ক্ষোভ প্রকাশ করিয়াছেন, আমি কেন চুল কাটছি না।
ভাতিজির কালো গাডার আমাকে দিইয়াছিলো চুলে খোঁপা বাঁধিবার নিমিত্তে। এমনকি মারুফা ভাবী (বিউটিশিয়ান) তিনিও আমার বেশকিছু গাডার দিইয়াছিলেন।
একদা আশ্বিন মাসে সাগরদাঁড়িতে আমাদের (বাংলা পরিবারের) একটা প্রোগ্রাম হইয়াছিল। সেখানে যাইবার প্রাক্কালে চুলগুলো স্টেট করিয়াছিলেম, কেননা ততদিনে কিছুটা কুঁকড়ে গিয়েছিলো চুল। সেই প্রোগ্রামে বনলতাও ছিলো। আমার বিক্ষিপ্ত বক্তব্য ও একটা গান ভিডিওতে ধারণ করা ছিলো, ওটা কলেজের অনুজা বর্ণালীকে শেয়ার দিইয়াছিলাম। ও ওর শ্বাশুড়িকে দেখাইয়াছিল; শ্বাশুড়ি বলিল, “তোমাদের বড় ভাই বাংলায় পড়ে তা দেখেই বুঝা যায়। সাহিত্যের একটা ভাব থাকা চাই বাংলার ছাত্রদের মধ্যে।” নীলফামারির সৈয়দপুরে বিখ্যাত চিনি মসজিদে আমার ভ্লগ দেখাইয়াছিল বান্ধবী শিউলী তাহার জননীকে, আমাকে বাবড়ি চুলে নাকি বেশ মানাইয়াছে বলিয়া জানাইয়াছিলো তাহার মা।
একদিন বন্ধু সানি আমাকে বলিলো, দোস্ত সবাই কিন্তু বড় চুল রাখতে পারে না, সবার হয়ও না, যাদের বড় চুল তারা একেকজন বিশেষ কেউ। দেখ তুই- নিউটন, কাজী নজরুল, রবীন্দ্রনাথ ওদের সবার কিন্তু লম্বা চুল। আবার অনেক ভাবুক সাধক আছে লালনের মত তাদেরও চুল বড় করে রাখা।

গত মাঘের ক্রান্তিকালে কলেজের বাংলা বিভাগ হইতে সিলেটে গিয়েছিলাম তিন দিনের সফরে। এক প্রকার পূর্বঘোষিত ছিল সিলেট ভ্রমণ শেষে আমার চুলকে বিদায় জানাইবো। সিলেটে একটা মাত্র কালো গাডার লইয়া গিয়েছিলাম। প্রথম দিনে চুল আঁচড়ানোর সময় কোথায় যে গাডারটা রাখিয়াছিলাম তাহা আর খুঁজিয়া পাইনি। চুল এ্যাড়া রাখিয়া বেশিক্ষণ থাকা আমার পক্ষে অনেকখানি অসম্ভব। ছোটবোনদেরকে বলিলাম, আপু তোমাদের কাছে কি একটা গাডার পাওয়া যাবে?
তাহারা গাডারের বিপরীতে ভিন্ন রকমের বস্তু ব্যবহার করিতেছিলো যাহার নাম আমার অজানা। কেউ কেউ ব্যাগের ভিতরে খুঁজিল কিন্তু পাইলো না, কেউ বা একগাল আপসেট মুড বদনে বলিল, স্যরি ভাইয়া।
ভারতী ম্যাম আমার এই গাডার চাওয়ার ব্যাপারটি শুনিতে পাইলো। ফলশ্রুতিতে তিনি তাঁহার ব্যাগ হয়তে বেগুনি কালারের একখানা গাডার বাহির করিয়া বলিল, তোমার গাডার লাগবে?
জ্বি ম্যাম, জুনিয়রদের কাছে খোঁজ করেও তো পাইলাম না।
আগে বলবা না, এই নাও!
অনেক অনেক ধন্যবাদ ম্যাম।
সিদ্ধান্ত নিইলাম, যতগুলো গাডার আমি পাইয়াছি তাহা সযতনে রাখিয়া দিইবো ব্যক্তিগত ছোট্ট জাদুঘরে।
দ্বিতীয় দিন বিছানাকান্দিতে যাইবার পথে বাস থামিল, কারণ স্বরূপ জানিতে পারিলাম উক্ত রোডে বাস চলে না, ইজিবাইক অথবা সিএনজি যোগে যায়তে হয়। আমি আর ইজাজ যেই সিএনজিতে উঠিলাম তাহার পিছনে চতুর্থ বর্ষের ৪ জন মেয়ে। উহাদের মধ্য হইতে একজন বলিল, ভাইয়া আপনার আর রেহমান আজিজ স্যারের বড় বড় চুলের কারণে আমাদের চুলগুলো বড় হচ্ছে না!
আমি কইলাম, তোমাদের চুলকে বলে দাও হিংসা না করে বন্ধুত্বসুলভ মনোভাব বজায় রাখতে, তাইলে প্রাশান্ত মনে তোমাদের চুলগুলোও বৃদ্ধি পাইবে।
ওদের হা হা হর্ষধ্বণিতে বন্ধুর রাস্তা মোটামুটি শান্তভাবেই পার হইলো।

এবার আমার কুন্তল কাহনের ইতি টানিবো।
চুল বড় রাখিবার কারণে ইতিবাচক- নেতিবাচক বিভিন্ন কথা কাহারো নিকট হইতে কোন অহ শুনিতে বাদ গিয়াছে তাহা আমার স্মরণে আসেনা। তবে ইহার মধ্যে নেতিবাচক উক্তি অধিকতর, যদিও ইহাকে ওই অর্থে নেতিবাচক বলা সমীচীন হইবে না। যাহারা আমার চুল নিইয়া বিরূপ মন্তব্য করিয়া থাকেন অথবা এতবড় চুল রাখিয়া দেয়া আমার অনুচিত হইয়াছে বলিয়া মনোভাব পোষণ করিয়া থাকেন তাহারা তো অপরিচিত কেহ নহে, আমার গ্রামেরই মানুষ, কতক স্বজন, কতক প্রতিবেশি। তাহাদের সহিত মনোমালিন্য হইয়াছে কিংবা বিরোধ বাঁধিয়াছ তাহার ইতিহাস একেবারেই সংকীর্ণ। সুতরাং তাহারা যে তাহাদিগকের অভিব্যক্তি আমার ওপর প্রয়োগ করিয়াছিলেন কল্যাণের কথা বিবেচনা করিয়া ইহাতে আর সংশয় থাকে না। কিংবা অধিকারবোধের দিক হইতে তাহাদের দৃষ্টিভঙ্গির দ্বারা হয়তোবা আমাকে দেখিতে চান। সুতরাং বেশভূষা একান্ত আপনার হইলেও ইহার বিরুদ্ধাচারণ সহ্য করিবার দায় আপনারই বর্তায়। ক্ষণিক উত্তেজিত হইয়া ক্রুদ্ধতা বশত অস্বাভাবিক হওয়া বড্ড বেমানান, কারণ আমাকে সমাজে বাস করিতে হয় এবং আমাকে তাহাদের সামনেও গোচরীভূত হইতে হয়। ইহা মানিয়া লইয়াই আমাদের বাস করিতে হইবে।
অন্যদিকে যাহারা আমার চুলের প্রশংসা করিয়াছেন, চুলের ব্যাপারে উৎসাহ প্রদান করিয়াছেন, এবং আমার চুল কিভাবে রাখিলে আরো সৌন্দর্য বৃদ্ধি পাইবে তাহার পরামর্শ দান করিয়াছিলেন তাহারা হয়তোবা কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুণ্ন হইবেন চুল কাটিবার কারণে। তাহাদিগকের প্রতিও আমার অগাধ ভালোবাসা।
তো এই হইলো চুল রাখিয়া আমার অর্জিত অভিজ্ঞতা, স্মৃতির পাতায় যেন জমাথাকে ইহার দিক বিবেচনা করিয়াই উক্ত অভিব্যক্তির ব্যঞ্জনা করিলাম।

✍️২০ চৈত্র ১৪৩০
চৌগাছা—যশোর।

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments