শেষ চিঠি
সন্ধ্যার পরথেকে জেলেদের নৌকার ওপর বসে আছি। চারিদিকে মায়া ছড়ানো নির্জনতা। ঝিঁঝিপোকার ডাক ধীরে ধীরে উচ্চকিত হচ্ছে, উত্তরের মৃদু বায়ু বয়ে যাচ্ছে শিহরণ জাগানিয়া অনুভূতি দিয়ে। কপোতাক্ষ এখন শান্তশিষ্ট, নিরবে স্রোত প্রবাহিত হচ্ছে, মাঝেমধ্যে মাঝগাঙে জলকেলিতে মত্তহচ্ছে ঝিয়া-পুঁটি মাছ। কার্তিকে সায়াহ্নের উপস্থিতিতে শীতের আগাম বার্তা কিছুটা হলেও জানান দিচ্ছে। মধ্যমা হেমন্তের কোলে জমাদিউল আউয়ালের শুক্লপক্ষ বেশ স্বচ্ছ। আকাশে বর্ণিল মেঘগুলো যেন পসরা সাজিয়েছে অর্ধচন্দ্রের তটে। তার অবয়ব অবতলের স্বচ্ছ সরবরে ভাব বিনিময়ের সাথে বেশ পরিস্ফুটিত। জলের ওপর একটা ঝিনুক ছুড়ে মারতেই অনেকগুলো স্নিগ্ধ ঢেউয়ের বলয় সৃজিত হলো, তাতে বাচ্চাদের দোলনার মত দোল খাচ্ছে অর্ধচন্দ্র। বাচ্চাশিশুর মত এভাবে চাঁদকে মাঝেমধ্যে আদর করতে বেশ ভালোলাগে।
আমাদের মালোঘাটের ওপারে কদমতলা গ্রাম, নদীর পাড় ঘেঁষে রৈখিক বসতি গড়ে উঠেছে বহু আগে। গ্রামটিতে বিদ্যুৎ সংযোগ ছিলনা, বছর তিনেক আগে এই সংযোগ সংযোজিত হয়েছে। এখন আর ছেলে-মেয়েদের সান্ধ্যলগ্নের পড়ার শব্দ ভেসে আসে না। শুধু ওই গ্রামে না, কোন গ্রামেই এখন আর পড়াশোনার আওয়াজ পাওয়া যায় না। একটা সময় বিদ্যুৎ ছিল না, হেরিকেন ও কূপির আলোতে পড়ার শব্দ আর ঝিঁঝিপোকার ডাকে মুখরিত হয়ে উঠতো পল্লীপাড়ার প্রদোষলগ্ন। ঝিঁঝিপোকার ভজনগীত যেন হারিয়ে গিয়েছে পড়াশোনার মত সেই কবে।
এসব ভাবতে ভাবতে হঠাৎ আমার ফোনটা বেজে উঠলো, আমার ফোনে এখনো অবধি ‘খোদা ওর মোহাব্বত’ নাটকের বাঁশির আবেগময় করুণ সুর রিংটোন হিসেবে আজ অবধি রয়ে গিয়েছে। অবশেষে ইজাজের ফোন…..
_ কী রে, ফোন রিসিভ করতে এতক্ষণ সময় লাগে কেন তোর? কই আছিস?
_ এইতো নদীর ঘাটে। তুই কি করিস?
_ স্মরণিকার কভার পেজটা ডিজাইন করলাম, দেখ তোর হোয়াটসঅ্যাপে দিয়েছি। কেমন হয়েছে জানাস। আর তোর লেখা দিচ্ছিসনে কেন এখনো?
_ আর সে কথা বলিসনে, একাজ ওকাজ করতে গিয়ে লেখার সময়টাই পাচ্ছিনে। আর ইদানীং লেখার সেই ভাবটাও মাথায় আসছে না, দেখি দ্রুত চেষ্টা করবো লেখাটা দেয়ার জন্য।
_ আচ্ছা, পারলে জুলাই অভ্যুত্থান নিয়ে কিছু লিখিস।
_ “৩৬’শে জুলাই” নামের ওই কবিতাটা দিবানে, আর একটা গল্প দেবো ভাবছি।
_ আচ্ছা, যা ভালো মনে করিস…..
এ কথাটা বলে ইজাজ ফোনটা রেখে দিল। বলে রাখা ভালো, আমাদের কলেজের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা স্মৃতি হিসেবে প্রতিবার “স্মরণিকা খেয়া”র আয়োজন করে, এবারও আমরা করতে চলেছি আরো আড়ম্বরপূর্ণভাবে। ইজাজ, সাদিক, মুজাম্মেল, আব্বাস, তারিফ, রাফা, ইলমা, শান্তা, মারিয়ম ও তপা আমরা এই ক’জন কমিটির দায়িত্বে আছি। সবাই কমবেশি লেখা দিবে, ওদের অনেকেই লেখা জমা দিয়েছে। অথচ আমি কোন বিষয়ে লিখবো তা নিয়ে বড় দ্বিধায় আছি।
সেদিন বান্ধবী মাইমুনার সাথে কথা বলছিলাম, আমার দৃষ্টিতে মাইমুনা যথেষ্ট রুচিশীলা একজন পাঠিকা। ওর বইয়ের কালেকশনগুলো দেখলে মন উৎফুল্ল হয়ে ওঠে, বইয়ের তাকগুলোতে নানা রকম বই’এর সমাহার। আমার কাছে নয়নাভিরাম লাগে।
ওকে বলছিলাম, কি লিখবো বুঝছি না। ও আমাকে পরামর্শ দিল গল্প লিখতে। বললো, তোর লেখা গল্প বরাবরই সুন্দর হয়। আনায়া কোন লেখা দিয়েছে কী?
_মনে হয় না।
ওর মুখ থেকে “আনায়া” শব্দটা শুনার পর জানিনা কতখানি মৌনতা অবলম্বন করেছিলাম। ওর নাম শুনলে, ওর কথা মনে উঠলে স্মৃতিগুলো আষ্টেপৃষ্টে ঘিরে রাখে আমার মনঃমস্তিষ্ক। নিকটতম বন্ধুরা সকলেই জানে আনায়া ও আমার বন্ধুত্বের গল্পটা। যেটা জানেনা কেউ, তা হলো আমাদের দুজনের মাঝে গভীর প্রেমের আখ্যান।
আনায়াকে মনে উঠতেই চারিদিকের সায়াহ্নলগ্নের সব কোলাহল যেন আমার থেকে বিদায় নিল। এতক্ষণ যতটুকু মুগ্ধতা নিয়ে পারিপার্শ্বিকতা অবলোকন করছিলাম তার সবটুকু নির্যাস শুঁষে নিয়ে ওর আঙিনায় আমার মনের নোঙর ফেলাতে বাধ্য করলো আনায়া। বছর দুয়েক আগে শরতের পড়ন্ত বেলায় ওর সাথে একদিন নৌকা বিলাস করেছিলাম হরিণার বিলে, সবসময় পানি থাকে ওখানে, শীত আগমনের প্রাক্কালে পদ্মফুলে ভরাথাকে, তখনকার দৃশ্যটা বেশি আকর্ষণীয় । বিলের পশ্চিমের পাড়ে কাশফুলের ঝটিকা বাগান, তাতে অস্তমিত সূর্যের সোনালি কিরণ কাশফুলের শুভ্রতার ওপর নিজের আল্পনা এঁকে দিয়েছিল। আনায়া কাছে এই দৃশ্যটা ছিল নৈসর্গিক। তাই আন্মনে ওর হাতটা কখন যে বাড়িয়ে রেখেছিল কাশবনের পানে তা-ও নিজেও জানেনা, আমি কয়েকটা ফটো তুলেছিলাম ওই মুহূর্তের। মাঝিকে বললাম, ভাই নৌকাটা কাশবনের ওদিকে নিয়ে যান। ধীরে ধীরে কাশবনের দিকে নৌকা বয়ে চলেছে, ও তখন খুশিতে আত্মহারা যেন বহুদিন পর সে ওর মায়ের কাছে ফিরছে। ওর ওই হাসিখুশি মুখটা আজও আমার হৃদয়ে নাড়া দেই।
আনায়ার ওপর প্রথম মুগ্ধতা এসেছিল প্রথম বর্ষের ওরিয়েন্টেশন ক্লাসে। অনেকেই লেকচার ডেস্কে গিয়ে নিজের মত করে অনুভূতি প্রকাশ করছিল, আর ওর বিষয়টা ছিল ভিন্ন। সে যখন মঞ্চে উঠতে যাচ্ছিল এক পলকে অপলক দৃষ্টি নিবদ্ধ হয়েগিয়েছিল ওর ওপর। ঈষৎ কোঁকড়ানো চুল কোমর অবধি পৃষ্ঠদেশ আচ্ছাদিত করে রেখেছিল। মাথার ওপরে ওড়নার কিয়দাংশ। লেকচার ডেস্কের সামনে দাঁড়িয়ে ‘ইমমান্যুয়েল’ শব্দ উচ্চারণ করে কিঞ্চিৎ মাথা নিচু করলো। বললো, আমি আনায়া গোমেজ। পরে আর কি বলেছিল, কতটুকু বলেছিল তা আর বলতে পারবো না, শুধু দেখেছিলাম মধ্যমা গড়নের দেহ, শ্যাম বর্ণের একটা মুখ তাতে দীপ্তি ছড়াচ্ছে।
ধীরে ধীরে ওর সাথে আমার বন্ধুত্ব শুরু হলো, ততদিনে জেনেছি ওর সম্বন্ধে সে-ও আমার সামগ্রিক পরিচয় জেনেছে। আনায়া গোমেজ একজন প্রটেস্ট্যান্ট খ্রিষ্টান। ওর বাবা একজন গির্জার প্যাস্টর। মোটামুটি রক্ষণশীল ইউনিটেরিয়ান পরিবারে ওর বেড়ে ওঠা। সে হিসেবে ধর্মের ভাবাদর্শ তার ভিতরে অনেকটা ফুঁটে উঠতো তবে ওটা ওর স্বভাবজাত।
পুরোপুরি না হলে সে ছিল অনেকটাই স্বাধীনচেতা ও সংস্কৃতিমনা। তাইতো বাংলা ডিপার্টমেন্টের প্রতিটা প্রোগ্রামে ওর সরব উপস্থিতি থাকতো। তবে আনায়ার প্রতি আমার বিশেষ মুগ্ধতা জন্ম নিয়েছিল ওর প্রকৃতি চেতনায় ভাববাদী মনোভাব, সুরেলা কণ্ঠ আর সহজতর জীবনবোধের কারণে। সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করতো ওর লেখাগুলো। এক নিভৃতাচারী লেখিকাসত্তা ওর মাঝে সুপ্তাবস্থায় বিরাজমান। ওর বেশ কয়েকটি ডায়েরি লেখা আছে, তার থেকে কিছু লেখা আমাকে পড়তে দিত। আমাকে বেশ কয়েকটি বই উপহার দিয়েছিল, যার মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চিরকুট ছিল। অভিভূত হতাম চিঠিগুলো পড়ে, শিলালিপির মত পরম যত্নে সংরক্ষণ করে রেখেছি ওগুলো।
তখন আমরা দ্বিতীয় বর্ষের ক্রান্তিলগ্নে, আমাদের বাংলা বিভাগ থেকে ট্যুরে যাবো দ্বীপ জেলা ভোলায়। ওখানে সবুজ বনের দুরন্ত হরিণ, মহিষের বাথান, পাখিরঝাঁক আর মেঘনা নদীর রূপালি ইলিশ সবাইকে মোহাচ্ছন্ন করে রাখে। সবচেয়ে আকর্ষণীয় জায়গা মনপুরা দ্বীপ ও চর কুকরি মুকরি তো আছেই। যাবে কি যাবে না এ বিষয়ে প্রথম দিকে সংশয়ে থাকলেও অবশেষে গিয়েছিল আনায়া, আমি না গেলে হয়তোবা যায়তো না ও। অগ্রহায়ণের মধ্যমা সময় তখন, শীতের আমেজ শুরু হয়ে গিয়েছে ইতোমধ্যেই। সবাই সাথে করে শীতের পোশাক নিয়েছিল, আমি আর আনায়া শুধুমাত্র চাদর নিয়েছিলাম। সন্ধ্যায় ক্যাম্পাস থেকে বাস ছেড়েছিল, ভোলায় পৌঁছেছিলাম সকালে, ওখান থেকে সরাসরি মনপুরায়। মেঘনা নদীর মোহনা ও সাগরতীরে অবস্থান মনপুরার। বালুময় প্রান্তর স্রোতের মত আস্তরণ পড়ে রয়েছে মনপুরার একাংশে, জেব্রার বাহ্যিক কাঠামোর সাথে তুলনা করলে মন্দ হবে না। তার সামান্য দূরে সাগরের জলরাশি। আমাদের থাকার জন্য সুন্দর একটা রিসোর্ট বুকিং করে রাখা ছিল। রিসোর্টটা ঘুরে ঘুরে দেখছিলাম দুজন, ও বেশ পছন্দ করেছে জায়গাটা। পর্যটন এরিয়া বিধায় নানা রকম প্রসাধনী ও হরেক রকম মুখরোচক খাবারের পসরা ছিল ওখানে। আনায়ার জন্য দু’পায়ের মল, রেশমি চুরি ও গলার মালা কিনেছিলাম, মালার সাথে দুইটা কানের দুল ফ্রি ছিল। অলংকারে ওর বিশেষ চাহিদা কিংবা আকর্ষণ খুব একটা কাজ করে না, ওগুলো নিজ হাতে ওকে পরিয়ে দিয়েছিলাম, এতে দুজনেরই সংকোচ কাজ করছিল। তবে উপভোগ্য ছিল বটে। সারাদিন চর কুকরি-মুকরিতে বেড়িয়ে নৈসর্গিক অনুভূতির পরশ চিত্তে মাখিয়ে ক্লান্ত শরীরে ফিরে এসেছি সবাই। এই ক্লান্তি ছিল রূপকথার অবগুণ্ঠন উন্মোচনের মত আনন্দের। সন্ধ্যায় রিসোর্টে ফিরে বিশ্রাম নিয়েছিলাম সবাই। সাথে হালকা জলযোগের সহিত নাস্তা। রিসোর্টের দু’ধারে উঁচু নিচু অনেক গাছ, তারমধ্য থেকে চন্দ্রিমার সুধা তার সবটুকু ঢেলে দিয়ে আমাদের সবাইকে যেন স্বাগত জানালো। কয়েকজন বড়ভাই ও বড়আপু মিলে স্যারদের নিকটে আবদার করলো রাতের ডিনারটা চরে বসে করবে। স্যাররা উপেক্ষা করতে পারলো না মজাদার এই আবেদন। পূর্ণিমা রাতে সাগরতটে ডিনার; ভোজন রসিক মানুষেরা কোনভাবে উপেক্ষা করতে পারে না। মৃদু শীতে সাগরকূলের হাওয়ায় অন্য রকম শিহরণ জাগানিয়া অনূভুতি হবে, আমরা গোল হয়ে বসে খাওয়া দাওয়া করবো, মাঝখানে মশাল জ্বলবে; এসব ভাবতে ভাবতে শরীরের পশম শিহরে উঠলো। রিসোর্টের পূর্বপাশে বাঁশ ও কাঠের বেলকনি ওটা ধরে এসব ভাবছিলাম আমি। এমতাবস্থায় মৃদুস্বরে কিন্নরকণ্ঠে ডাকলো, “এই কই তুমি? “
চেয়ে দেখলাম আনায়া গোমেজ, হাতে দুইটা চায়ের কাপ, আমার দিকে এক কাপ এগিয়ে দিয়ে বললো,
_ বাহ রে, একাই চলে এলে, বললে না তো।
_ মাত্রই আসলাম, রিসোর্টটা দেখতে দেখতে এখানে আঁটকে গেছি। চা কই পেলে তুমি?
_ কিচেন রুম দেখতে গেছিলাম স্যার ম্যামদের সাথে, ওখানে আমাদেরকে চা পান করতে দিয়েছিল।
_ আচ্ছা, অনেক অনেক ধন্যবাদ।
চায়ে দু চুমুক দিয়ে বললো,
_ পরিবেশ টা অনেক সুন্দর তাইনা?
_ হুমম, আমার যদি এরকম একটা নিবাস থাকতো;
প্রার্থীর মত নিচুস্বরে বললাম আমি। ও আমার গাঘেঁষে ঝুঁকে ছিল বেলকনির মোটাবাঁশের ওপর, মুখের দিকে চেয়ে মৃদু হাসলো কোন শব্দ ছাড়ায়। চন্দ্রিমার আলোয় ওর বদনখানি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল। কানের দুলে বিকিরণ ছড়াচ্ছিল জোছনার দ্যুতি, দেখে মনে হলো জ্যোৎস্নাস্নান করেছে মাত্র, অপ্সরার মত দেখাচ্ছে ওকে। কিছুক্ষণ মৌনতা অবলম্বন করার পরে বললো,
_ চলো
_ কোথায়?
_ বাইরে যাবো আমি, চরের ওদিকে।
_ মাথা খারাপ নাকি, স্যার ম্যাম যায়তে দিবে আমাদের, নিরাপত্তার ব্যাপার স্যাপার আছে। যাওয়া ঠিক হবে না।
_ তুমি যাবে কিনা? না গেলে থাকো। আমি একাই যাচ্ছি।
এ কথা বলেই হনহন করে হাঁটা দিলো বাইরের দিকে, আমিও ওর পিছু নিলাম। ভাগ্যিস স্যার ম্যাম কেউ দেখেনি আমাদের। রিসোর্টের দিকে তাকায়ে দেখি বারান্দায় কিংবা বেলকনিতে কেউ নাই, সবাই ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরকে বিশ্রামে ঠেলে দিয়েছে কয়েক নিমেষের জন্য, সাথে খোশগল্প আর চায়ের আড্ডা চলছে নিশ্চয়ই। জোছনার আলোয় সবকিছু ঈষৎ ফকফকা দেখাচ্ছে শিশিরস্নাত ঊষালগ্নের ন্যায়। রিসোর্টের রুম থেকে বের হলেই আমাদেরকে দেখে ফেলতো নিশ্চয়ই। ঝাউবন থেকে ঝিঁঝিপোকার আরাধনা ভেসে আসছে, উত্তরপ্রান্তে মেঘনার মোহনা হতে বিচিত্র রকমের পরিযায়ী পাখির কলরবে মুখরিত মনপুরা। আমরা ততক্ষণে রিসোর্ট থেকে বেশদূরে চলে গিয়েছি। এখান থেকে সাগরের জলরাশি দেখা যাচ্ছে, বাঁধাহীন ঢেউ একেরপর এক আঁছড়ে পড়ছে তটে, সুধাকরের সুধাময়ী জ্যোতি ঊর্মিমালাকে গিটারের ছন্দের মত অবিরত একসুরে বাজিয়ে চলেছে, অথচ দেখতে বা শুনতে কোন একঘেঁয়েমি নেই। আনায়া প্রকৃতির এই অপার লীলা বিমুগ্ধচিত্তে অবলোকন করছে আর গুণগুণিয়ে ‘এই মোম জোছনায় অঙ্গ ভিজিয়ে এসো না গল্প করি….’ গানটা গাইছে। ওর কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম, ও গায়ে চাদর জড়াতে ভুলেনি। আমার গায়ে শার্ট ছাড়া আর কিছুই ছিলনা। ঠান্ডা হাওয়া বয়ে চলেছে, আমার শীতার্ত চেহারার দিকে একপলক চেয়ে রইলো, ও নিশ্চয় বুঝতে পারছে উষ্ণতা দরকার আমার। আমি ততক্ষণে নিশ্চুপ, হয়তোবা ভাবছে ওর চাদরের শেয়ার চাইছি, যদিও এমনটা আশা করিনি। আশা করে নিরাশ হওয়ার আক্ষেপটা বড় নিদারুণ। মিনতির স্বরে বললাম,
_ একটা গান শুনাবা?
_ কোন গানটি শুনতে চাও? মুচকি হেসে আবেগপূর্ণ কণ্ঠে জানতে চাইলো ও।
_ প্রতিটা শুক্লপক্ষে যেটা গাও তুমি, পরিবেশটা যথেষ্ট উপযুক্ত এই গানটির গাইবার জন্যে।
স্বল্প সময়ের জন্য কি যেন একটা ভাবনায় বুঁদ হয়ে গেল, কোমলস্বরে বললো,
_ আমার হাতটা ধরবে?
আমার ভিতরে কেমন জানি একটা দোলা দিলো। ওর হাতটা ধরলাম, ইতোপূর্বে কোন না কোন প্রয়োজনে ওর হাতের স্পর্শ পেয়েছি কিন্তু তেমন কিছু অনুভব হয়নি, আজ কেন জানি অন্য রকম শিহরণ জাগলো। নির্বাক হয়ে ওর প্রতি চেয়ে রইলাম। উত্তরে বায়ু সক্রিয় রয়েছে, সাগরের ঢেউয়ের শব্দ আছড়ে পড়ছে উপকূলে, একঝাঁক সামুদ্রিক গাংচিল সমবেত কলরবে চিউ চিউ করে উঠলো, রিসোর্টের ওদিক হতে চকোরের প্রণয়ের স্বর চড়াও হচ্ছে। দৈবাৎ আলতো স্পর্শ করে আমার বুকে মাথা রাখলো আনায়া! সমস্ত শরীরে শিহরণ দোল খেয়েগেলো, হৃদস্পন্দনের কম্পন অনুভূত হতে লাগলো। ওর চুলের ঘ্রাণ মাতোয়ারা করে তুলেছে আমাকে, অপ্রশস্ত মৃদুভাবে চুম্বন করলাম উপরিভাগের আবৃত কুন্তলে। যেন ও বুঝতে না পারে।
_ এভাবে সারাজীবন আমাকে আগলে রাখতে পারবে না!
_ হ্যাঁ……
কিছু বাস্তবতার কথা ওকে বলতে গিয়েও বললাম না, আবেগঘন মুহূর্তে এ বয়ান খাটে না। যদিও সে আমার থেকেও বেশি বাস্তববাদী। কিছুক্ষণ পরে নিজেকে সংযত করে নিল, চুলগুলো এলোমেলো হয়ে গিয়েছিল আমি ঠিক করে দিলাম। এ বিষয়ে কতকটা পারদর্শী হয়েছি, আমারও লম্বা লম্বা চুল, খোঁপা বাঁধতে হয় ছোট করে। এখন বুঝি, মেয়েদের সাজুগুজু করতে গুছায়ে নিতে কেন দেরি হয়, চুল বড় রাখার কারণে এতটুকু উপলব্ধি হয়েছে।
ওর কাঁধে আমার দুবাহু, মুখের দু’পাশের চিবুক হালকা করে টেনে গাইলাম,
“কছম হায় তুমহে তুম আগার মুজছে রুঠে
রাহে সাস জাবতাক ইয়ে বান্ধান না টুটে
তুমহে দিল দিয়া হ্যা, ইয়ে ওয়াদা কিয়া হ্যা
সানাম মে তুমহা-রি রাহো-ঙি সাদা”
মৃদুলাজ বদনে মুচকি হাসি দিলো আনায়া। চোখে তার আনন্দের অশ্রু জমাটবদ্ধ হয়েছে। গানটা ওর গাওয়ার কথা ছিল কিন্তু প্রেমোদ্দীপ্ত ক্ষণে কণ্ঠ বেসামাল ছিল। হালকা করে গলাঝাড়া দিয়ে শুনাইলো ওর কণ্ঠের জাদু,
“ইয়ে রাতে ইয়ে মওসাম নদি-কা কিনারা ইয়ে চঞ্চল হাওয়া
কাহা দো দিলো-নে কি-মিলকার কাভি হাম, না হোঙে যুদা
ইয়ে রাতে ইয়ে মওসাম নদি-কা কিনারা, ইয়ে চঞ্চল হাওয়া”
এভাবেই ওর আর আমার এতবেশি কাছাকাছি আসা, অতি ঘনিষ্ঠ হওয়া, নিবিড় বন্ধনের আল্পনা আঁকা। আমার লেখালেখির ব্যাপারটা আনায়া অনেকবেশি সম্মানের সাথে দেখতো। আমার লেখা যেকোন কিছু ওর কাছে স্পেশাল উপহারের মত ছিল। বিশেষ করে কবিতা। একদিন বাংলা নববর্ষে আমরা একসাথে সময় কাটায়ে ছিলাম। ও শাড়ি পরতো না শুধুমাত্র আমার জন্য শাড়ি পরেছিল, আমি পরেছিলাম পাঞ্জাবি। ও সুন্দর করে বসেছিল কংক্রিটের শান বাঁধানো আসনের ওপর, কয়েকটি ছবি তুলে দিয়েছিলাম। তার মধ্যে একটা ছবি আজও ওর ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার হিসেবে আছে। ওদিন প্রথম ওর জন্য একটা কবিতা লিখেছিলাম, ওই কবিতা পড়ে ওর মুগ্ধতার কথা প্রায়ই আমাকে বলতো। ওর অভিভূত হওয়ার কারণ ওকে নিয়ে কেউ কোনদিন কিছু রচনা করেনি, অনুভূতির কল্পলোকের পসরা সাজায়নি, মূলকথা আমার মত করে কাউকেই ও পাইনি। আমার ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা একই রকম ছিল, বন্ধু-বান্ধবীর অভাব নেই আমার। স্নেহের অনুজ অনুজাও ছিল অনেক, তাদের সাথেও যথেষ্ট সখ্যতা ছিল। সামষ্টিক মানসিক চিন্তাভাবনার এতবেশি মিল আনায়া ছাড়া আর কারোর সাথে হয়নি, ভবিষ্যতেও ওরকম মিল কারোর সাথে হবে বলে মনে করিনা। এখানেই আমাদের বন্ধনটা চিরন্তনের আভাস যোগায়।
তখন আমাদের তৃতীয় বর্ষের ইনকোর্স পরীক্ষা শেষ, অন্যান্যদের তুলনায় বিভাগীয় সেমিনারে আমাদের সময় কাটতো বেশি। ওর বাবা গির্জার সম্মানিত ব্যক্তি, সমাজের কাছে ওর পরিবারের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। সে মর্যাদায় বিন্দুমাত্র আঁচ লাগুক ওটা কখনো চাইনা ও, এজন্য বাইরে কোথাও সময় কাটানোর ব্যাপারে ঘোর আপত্তি ছিল। ও একদিন আমার জন্য নুডলস রান্না করে এনেছিল সাথে একটা উপন্যাস উপহার দিয়েছিল, ব্যাপারটা দারুণ লেগেছিল আমার কাছে। ও যতক্ষণ আমার সাথে থাকবে ততক্ষণ উপন্যাসটা খুলে দেখা মানা। আনায়া বাসায় চলে গেলে ক্যাম্পাসে বসেই উপন্যাসের ভেতরটা দেখলাম, আমি জানতাম বইটার ভেতরে নিশ্চিত ওর লেখা চিরকুট থাকবে। হয়েছিলও তাই। প্রচ্ছদ উল্টাতেই দেখলাম সুন্দর করে লেখা আছে “আনায়া গোমেজের লেখক সাহেবের জন্য”, পরের পাতা উল্টায়ে আরেকটি লেখা পেলাম বইয়ের পাতাতেই, “তুমি মানেই মায়া- মুগ্ধতা আর আকাশ সমান ভালোবাসা”, এরপর কয়েকটি পাতা উল্টাতেই দেখলাম কাঙ্ক্ষিত চিরকুট যেখানে সে লিখেছিল_
” তোমার জন্য আমার পক্ষথেকে এটাই প্রথম উপহার লেখক সাহেব। প্রথম যেদিন কথা হয়েছিল কই সেদিন তো এতকিছু ভাবিনি, তুমি ছেলেটা কেমন সেটাও জানার আগ্রহ জাগেনি। তারপর কথা হওয়ার পর থেকে তোমার গুণ, তোমার বৈশিষ্ট্য, ব্যক্তিত্ব সব ভীষণ নজরে আসার মত সেটা লক্ষ্য করলাম। সাথে তৈরি হলো একরাশ মুগ্ধতা, আর সেই মুগ্ধতায় এখনো ডুবছি, আগামীতেও ডুববো। আর হ্যাঁ, ভাবতেও অবাক লাগে তোমার জীবনের কোথাও না কোথাও আমি আছি। আমাকে সৌভাগ্যবতী অনুভব করানোর জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”
নিজেকে এতদিনে গর্বিত বলে মনে হচ্ছিল। কেউ একজন তো আছে আমাকে নিয়ে নির্জনে নিভৃতে এভাবে মায়ারজাল বুনতে পারে।
এরপর বেশ কয়েকটি বই তার থেকে উপহার হিসেবে পেয়েছি, সাথে চিরকুট তো ছিলই। দিনগুলো ভালোই যাচ্ছিল। তবে নিয়তির বড় এক বেরাম আছে, একটানা সুখ কেন জানি সে চক্ষুশূল হিসেবে দেখে তাইতো অমানিশার মত ঘোর অন্ধকার আমাদের মাঝে চাপিয়ে দেই। আমাদের সকলের চাওয়া যখন একটুখানি হলেও ভালোথাকা তখন অল্পস্বল্প দুঃখবোধ পিছু ছাড়বে কেন? কিন্তু এই স্বল্প পরিসরের বিদঘুটে মুহূর্ত যখন দীর্ঘ হয় জীবনের প্রতি সেই মায়া, ভবিষ্যতের গৌরবময় আশার সেই কল্পনা সবকিছু ফিঁকে হয়ে যায়। যাকে কেন্দ্রকরে জীবনের রঙিন সব আয়োজন সে যদি না থাকে তখন সবকিছুই জরাজীর্ণ লাগে। জীবনের নানাবিধ পরাজয় এখানে এসে জড়োহয় বুঝি। সময়টা ছিল চতুর্থ বর্ষের শুরুর দিক, বেশ কয়েকদিন ধরে আনায়া ক্লাসে আসে না, আমার সাথে ঠিক মত কথা বলে না। অবশ্য আমাকে বলেছিল কিছু দিনের জন্য ওরা কক্সবাজার যাবে মামার শ্বশুর বাড়িতে, আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে ঠিক মত কথা বলা হয়ে উঠবেনা হয়তোবা। তাই যেচে পড়ে খুব একটা কল দেওয়া হয়নি।
কিছুদিন পরে ওর সাথে কথা হলো, রাগারাগি করেছিলাম বেশ। আমি যতটা রাগ দেখাইছিলাম ততধিক ক্রুদ্ধহয়ে ও ওর অবস্থান জানান দিলো। ইতোপূর্বে অমর্ষিত আচরণ কখনোই দেখিনি শুনিনি, আমি থ মেরে গেলাম, হতবাক হয়ে গেলাম, এই কি সেই মেয়ে? যে আমাকে বলেছিল, ” তুমি কষ্ট পাও এমন কোন কিছু করবে না আনায়া”, অথচ আজ এরকম ব্যবহার! কি হয়েছে ওর? এসব ভাবতে ভাবতে দুদিন কেটে গেলো। ওর সাথে কোন কথা নেই, ক্লাসেও যায় না দু’তিন দিন। পরের দিন সকাল নয়টার দিকে কল দিয়ে কাতরস্বরে বললো,
_ ক্যাম্পাসে আসবে কখন? আমি তোমার অপেক্ষায় আছি। তোমার সাথে জরুরি কিছু কথা রয়েছে।
_ থাকো আসছি আমি।
ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বললাম আমি, কিছুটা কর্কশ শোনাচ্ছিল হয়তো। ওর ওপর কোন অভিমান অনুযোগ নেই, শুধু জানার ইচ্ছে ‘কি হয়েছে তোমার?’
আধা ঘন্টা পরে ক্যাম্পাসে গেলাম, এতদিন অবধি ওর জন্য অপেক্ষা করতাম সেদিন ও আমার জন্য অপেক্ষা করেছে। একদিনের জন্য হোক তবু্ও বিষয়টা আনইজি বোধ হচ্ছিল। গিয়ে দেখি লাইব্রেরী কক্ষের এক কর্ণারে বসে আছে, অনেকটা মঠবাসিনীর মত সাজ তার, জীর্ণাশীর্ণা মনেহচ্ছে। রোজকার মত চাকরীর পড়ায় আত্মমগ্ন দেখলাম সবুজ, আরবী, সুস্মিতা ও সাথীকে। ওদের সাথে দেখা হওয়া মানে গুণেগুণে কয়েকটি শব্দের টিপ্পনী সহ্যকরা, আড়চোখে কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে হয়তোবা বলবে, কি-রে কেমন চলে? সাথে ঝালমুড়ির আড্ডার খরচটাও মানিব্যাগ থেকে খসতে পারে, তাই সন্তর্পণে ওদের পাশ কাটিয়ে গেলাম। আনায়ার পাশে বসলাম নিঃশব্দে, মলিন বদনখানি আমার দিকে চাইলো। মুখে কোন কথা নেই অথচ পঞ্চেন্দ্রিয় যেন হাজার বছরের জমানো দুঃখ প্রকাশ করতে ব্যাকুল। আড়ষ্টতার দ্বার উন্মুক্ত করে জিজ্ঞেস করলাম,
_ কি হয়েছে তোমার?
কোন উত্তর দিল না, জবাব দিল অশ্রুসিক্ত নয়ন। সে কাঁদতে পারে না অন্য মেয়েদের মত তবে চক্ষুদ্বয়ে নীরবিন্দু ঠিকই প্রস্ফুটিত হয়। এমনিতেই এলার্জির সমস্যা তার ওপর চোখ মুছতে গেলে কয়েক ডলা ঠিকই বসায়ে দেই চোখের পাতায়। পুনরায় প্রশ্ন করলাম শান্তভাবে,
_ আমার সাথে এরকমটা না করলে কী হতো না?
_ ক্ষমা চাওয়ার কোন ভাষা জানা নেই আমার, তবুও মিনতি করবো আমাকে ক্ষমা করো তুমি। ঈশ্বর আমাকে এমন বিড়ম্বনায় রেখে পরীক্ষা করবেন কখনো ভাবিনি।
_ কেন, কী হয়েছে বলবে তো আমাকে।
_ আমাকে কক্সবাজারে নিয়ে যাওয়ার পিছনে তাদের অন্য কোন পরিকল্পনা থাকবে তা আমি জানতাম না। মামীর বোনের ছেলে রবার্ট ইথান, সদ্য পড়াশোনা শেষ করেছে রোমানিয়া থেকে। বুখারেস্টে আত্মীয়ের বাসায় থাকতো সে। ওই বাড়িটা আর্চবিশপ পরিবারের। ইথানের বাবার চাওয়া অনুযায়ী পবিত্র নিউ টেস্টামেন্টের ওপর যথেষ্ট জ্ঞানার্জন করেছে। বাবার কথা, ‘ইউরোপের সমাজ ব্যবস্থা ধর্মহীনতার পথে, মহামতি যিশুর অনুসারীর অভাব নেই, কিন্তু তাঁর শিক্ষানিয়ে কেউ চলছে না। ( যিশুর নাম নিতেই চক্ষু মুদিয়ে গলার ক্রুশচিহ্নিত ছোট্ট লকেটটা নিয়ে বুকে মুখে কপালে ঠেকিয়ে প্রথমে বক্ষের ডানপাশে পরে বাম পাশে ছোঁযালো ) ইথান দিনে দিনে ধার্মিক হয়ে উঠেছে আর্চবিশপের সহচার্যে। বিশপ তাকে বুখারেস্টের দ্বিতীয় বৃহত্তম চার্চের সহকারী অর্চক Priest হিসেবে রেখেছেন। এর আগে সেমিনারিয়ান ও ব্রদার ছিল’ (একটু বিরতি নিয়ে পুনরায় ও বললো)
ইথানের সাথে ইন্টারে প্রথম পরিচয় হয়েছিল আমার। ও ভীষণ রকমের মেধাবী ছিল। আত্মীয় স্বজনরা সবাই ওকে ভীষণ সমীহ করতেন। আর মা আমাকে জানায়েছে ইথান ওর স্ত্রী হিসেবে আমাকে গ্রহণ করতে ইচ্ছুক। এখন আমাদের পরিবারের সবার চাওয়া ওর সাথে আমার বিয়ে হোক! বিশেষ করে আমার বাবা ও মামার চাওয়াটা অধিক। ওনাদের সামনে আমার আপত্তির কথা জানাতে পারিনি। মা’কে বলেছিলাম আমার অনিচ্ছার কথা, মা আমার চাওয়াকে সমর্থন করলেও তিনি বাকি সবার কাছে নিরূপায়। নিজেকে চেপে রাখতে পারিনি, তোমার কথা অকপটে বলে দেয়ার পর যেন আমার কাল হয়ে দাঁড়ালো। মা আমার ওপর চরমভাবে রুষ্ট হয়ে বলেছে, “তোর এত বড় সাহস হয় কি করে, ভুলে গেছিস তুই কোন পরিবারের মেয়ে আর তোর বাবা কে? পরিবার, সমাজ, ধর্ম এতটাই তুচ্ছ হয়েগেলো তোর কাছে? শেষ পর্যন্ত একটা মুসলিম ছেলের সাথে তুই! হায় ঈশ্বর তুমি ওর সুবোধ দাও!”
আমার কিছু বলার ভাষাটাও হারিয়ে গিয়েছে। বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম কিছুক্ষণের জন্য। না দিতে পারছি নিজেকে সান্ত্বনা না পারছি ওকে। মৌনতা কেড়ে নিল মুখের সবভাষা। পরিস্থিতির কাছে এতটাই অসহায় আমরা। কিছুক্ষণ পরে জিজ্ঞেস করলাম,
_ এখন কি করতে চাও তুমি?
_ জানিনা কি করবো!
আমাদের চোখের সামনে ধূসর সাহারা, দিগন্ত জুড়ে এর বিস্তার, পথ খুঁজে কোথায় গন্তব্য তা জানিনা। সবকিছু মরিচিকার মত ঝাপসা দেখছি। ওকে বললাম,
_ আজ তুমি বাসায় যাও। একান্তে শান্ত মনে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা ব্যতীত আর কোন উপায় দেখছি না এখন।
পরদিন সকালে আমরা দেখা করি, গতরাতে অনেক বেশি চিন্তা ভাবনায় বিভোর ছিলাম। শাঁখের করাতের অগ্রভাগে আমাদের গ্রীবা।
_ দেখো আমরা একে অপরকে ভালোবাসি এটাতে আমাদের মাঝে কোন সংশয় বা সন্দেহ আছে কী?
_ না।
_ আমি তোমাকে কঠিন সিদ্ধান্তের মধ্যে ফেলে দেবো না, বরংচ আমার দিকথেকে আমি বলবো তোমার আদর্শের জায়গাটাকে আরো বেশি সমৃদ্ধ করতে। তোমার দ্বারা এমন কিছু না হোক যেমনটা তোমার মা বলেছে, তোমার পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, ধর্মের কাছে তুমি লাঞ্ছিতা হও এমন কিছু না করাই তোমার জন্য উত্তম।
ওর মুখে কোন কথা নেই, মাথাটা ঝুঁকিয়ে রেখেছে বেঞ্চের দিকে। আত্মসমর্পণকারী আসামির মত লাগছে ওকে। কথায় আছে, যুদ্ধ ও প্রেম কোন নিয়ম মানে না। আমি ভাবছিলাম ও হয়তোবা সবকিছু তুচ্ছ করে আমার হতে চাইবে, এবং এটা ও ওর নিজ মুখে বলবে। কিন্তু না, ও ওর স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যে অনড়। এতদিন ওর এই আদর্শকে সম্মান জানিয়ে এসেছি, অথচ এটাই আমাকে দংশন করেছে। তবুও বলবো ও ভুল কিছু করছে না।
এভাবেই কেটে গিয়েছে আরো একটা বছর। ওর বিয়ে হয়েছে রবার্ট ইথানের সাথে। ব্যক্তিগত জীবনে আনায়াকে ছাড়ায় চলে যাচ্ছে দিনগুলো। ওর সাথে কথা হয়না এমনটা না, খুব কমই কথা হয় এবং বেশ দরকারি। ইতোমধ্যে স্নাতক পাশ করেছি আমরা। স্নাতকের বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে ওর করা আবৃতিটা আজও প্রাণে দোলা দেই।
“বিদায়, হে মোর বাতায়ন-পাশে নিশিথ জাগার সাথী।
ওগো বন্ধুরা, পাণ্ডুর হয়ে এলো বিদায়ের রাতি!
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ আমার জানালার ঝিলিমিলি,
আজ হ’তে হ’ল বন্ধ মোদের আলাপন নিরিবিলি…”
স্নাতকোত্তরে ভর্তি হওয়ার খুব বেশি ইচ্ছে ছিল না ওর, ইথানের সাথে রোমানিয়ায় থাকবে বলে জানতে পেরেছিলাম। এখনো যায়নি, কবে যাবে সেটাও জানিনা। রোমানিয়াই থাকতে খুববেশি অনিচ্ছা থাকার কথা না ওর, ও যেমন ধরনের প্রকৃতি- সমাজ পছন্দ করে তার জন্য ওই দেশটা আদর্শিক হবে। শীত প্রধান অঞ্চল ওর বেশ পছন্দের। তবে এটাও সত্য সবকিছুর উর্ধ্বে বাংলাদেশ ওর শিরা উপশিরায় প্রবাহিত।
এইতো কয়েকমাস আগে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পুরোদস্তুর বিস্তার লাভের কিছুদিন পূর্বে কোটা সংস্কার আন্দোলনে আমাদের সাথে যোগ দিয়েছিল ও। তখন আমাদের ইনকোর্স পরীক্ষা চলছিল মাস্টার্সের। আমাদের সাথে আন্দোলনে গিয়েছিল ছ-মাসের অন্তঃসত্ত্বা বান্ধবী শান্তা। এরকম হাজারো মা-বোন ও সময়ে রাস্তায় নেমেছিল। এরপর থেকে সারাদেশে গণবিপ্লব ফুলেফেঁপে উঠেছিল অশান্ত আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের মত। সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সহ সমস্ত অফিস আদালত বন্ধ হয়ে যায়, জারি হয় কারফিউ। ছাত্র-জনতার ওপর নির্মম পাশবিক হত্যাযজ্ঞ চালায় ক্ষমতাসীন সরকার।
৫ আগস্টের আগের ওই দিনগুলো ছিল বিভীষিকাময়, সবসময় আতঙ্কে থাকতাম, রাতে নিজের ঘরে থাকতে ভয় লাগতো। কখন না জানি ডিবি পুলিশ চলে আসে! শেষের দিকে রাতে ঘরে ঘুমাতাম না। এরকম পরিস্থিতিতে আনায়া নিয়মিত আমার খোঁজ খবর রাখতো। ও রাতে ঘুমাতে পারতো না ছাত্র জনতার বিভৎস আর্তনাদ দেখে ওদের মৃত্যুর সংবাদ শুনে। ওকে বলতাম ওসব খবর তুমি দেখো না আর, ফেসবুক ইউটিউব ইউজ করা আপাতত বন্ধ রাখো। ও এসব সহ্য করতে পারতো না আবার না দেখেও থাকতে পারতো না। দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়ার পরে এসএমএস করতো আমাকে। নির্ঘুম অর্ধেকরাত কেটে যেত দেশের কথা বলে। ও রাজনীতি ‘র’ বোঝে না, ওসব ওর ভাল্লাগে না অথচ সে সময়ে ও যেন আরেক বিপ্লবী। ও প্রায়ই বলতো, আচ্ছা ও মহিলার (সরকার) মনে কি একটুও মায়া-দায়া নেই না ওর আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে কোন ছেলেমেয়ে নেই, এতগুলো ছেলেমেয়ের প্রাণ কেড়ে নিতে কী ওর একটুও বিবেকে বাঁধছে না!
শেষমেশ ঐতিহাসিক সেই মুহূর্ত আসে ৩৬ শে জুলাই দুপুর আড়াইটাই। ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকার দেশথেকে পালিয়ে যায়। ওই সময় আনায়াকে কল করে বলেছিলাম “আনায়া লাভ ইউ”, আমাকেও সে বলেছিল “লাভ ইউ জান!” মূলত ও সময়ে দু’জনেই আবেগ তাড়িত ছিলাম বিজয় উল্লাসে, বুকের ওপর থেকে জগদ্দল পাথরের বোঝা সরে যাওয়ার স্বস্তিতে।
জেন-জি’র নতুন বাংলাদেশে আমাদের পুনরায় দেখা হয় ক্যাম্পাসে। ইনকোর্স পরীক্ষা শেষে বটতলায় বসি দু’জন। ভাবছিলাম ওর হাসবেন্ড সম্পর্কে কিছু জিজ্ঞেস করবো তা আর পারিনি, খারাপ লাগছিল, বিবেকে বাঁধা দিচ্ছিল। কিছুক্ষণ পরে ও আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
_ তোমার দিনকাল কেমন যাচ্ছে?
_ চলছে একরকম। তোমার?
_ এইতো চলে যাচ্ছে।
_ আমাকে কী আগের মত করে মিস করো?
_ সময়টা তো তোমারই দখলে, এমন একটা মুহূর্ত আসে না যেখানে তুমি থাকোনা।
কথাটা বলতে বলতে ওর চোখে জল ছলছল করছিল। তন্মুহূর্তে ও জিজ্ঞেস করলো কান্নাজড়িত কণ্ঠে,
_ আচ্ছা আমি যদি তোমার সাথে আর কথা বলতে না পারি যোগাযোগ রাখতে না পারি তখন কী আমাকে একটুও মনে পড়বে?
_ যার জন্য ভালোবাসার বিশালতা তার মনের কোন কোনায় এক সময় থাকবোনা এটা আজকাল আর মানতে পারিনা!
এরপর অনেকক্ষণ দু’জন স্তব্ধ হয়ে ছিলাম, নিজ নিজ ভাবনার জগতে একে অপরকে নিয়ে বিভোর। সহসা মুখ থেকে দুটো কথা বেরুবার জো নেই। একটা ছোট শপিং ব্যাগ আমার হাতে তুলে দিয়ে কাতর কণ্ঠে বললো,
_ তোমার জন্য কয়েকটা বই কিনে রাখছিলাম, দেওয়ার তো আর সুযোগ হয়নি! যত্নে রেখে দিও। আমার উঠতে হবে এখন, বাসায় আত্মীয় এসেছে ইথানের পরিবার।
এ কথা বলে ও উঠলো, আমি নিরবে বসে রইলাম। আমার মাথায় ওর আঙুলগুলো বুলায়ে দিয়ে বললো,
_ শোন নিজের ওপর যত্ন নিবা। পড়াশোনাটা ঠিক মত করবা আর স্বাস্থ্যের যেন অবনতি না হয় আর। আসি হ্যাঁ….!
এই কথাগুলো বলে ও চলে গেলো, ও জানতো আমি প্রত্যুত্তর দিলে ও আর জবাব দিতে পারবে না চোখের জল ছাড়া। আসলে জীবন্ত মানুষ জীবন থেকে চলে যাবে মৃত্যু ছাড়া এটা মেনে নেয়া সম্ভব না। মৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করা গেলেও অমৃত্যু যন্ত্রণা সহ্য করা অনেক কঠিন।
ও আমার জন্য তিনটা ভিন্নতর বই উপহার দেই ওদিন, যার মধ্যে একটা বইয়ে ছোট বড় মিলিয়ে মোট দশখানা চিরকুট ছিল সাথে ছিল শিউলী ফুল। আরেকটা বইয়ে শিউলি ফুলে লাভ চিহ্ন সাজিয়ে তাতে লিখে রেখেছিল,”আনায়া গোমেজের স্মৃতি” সাথে বাংলা তারিখটা। তারমধ্যে একটা চিঠি। এটাই ওর থেকে পাওয়া শেষ চিঠি_
“তোমাকে বই উপহার দেয়ার একটাই কারণ, আমার প্রতি জমানো মুগ্ধতা ফুরালেও বইয়ের প্রতি কখনো সে মুগ্ধতা হারাবে না তুমি। এই বইগুলোর মাধ্যমে হলেও তুমি আমাকে মনে রাখবে। মানুষকে ভুলে গেলে বা মানুষের প্রতি জন্মানো ভালোবাসা একদিন হারিয়ে গেলেও বইয়ের প্রতি যে মুগ্ধতা তা চিরকাল রয়ে যাবে তোমার। কেননা এটাই যে তুমি, এটাই তোমার বৈশিষ্ট্য তা এতদিনে একটু হলেও বুঝেছি। কোন একদিন আমি আমার অস্তিত্বর আর হয়তোবা খোঁজ রাখবে না পরিস্থিতির কারণে। কিন্তু সেদিনও এই বইগুলোর জন্য আমাকে মনে পড়বে তোমার। তোমার মনে নিজেকে ধরে রাখার যে বড্ড লোভ আমার, প্রিয় লেখক সাহেব।”
🗒️অগ্রহায়ণ ১৪৩১
✍️আবুজার হুসাইন


