Saturday, June 6, 2026
বাড়িসাহিত্যস্মৃতি আমারে কাঁদায় - আবুজার হুসাইন

স্মৃতি আমারে কাঁদায় – আবুজার হুসাইন

সেদিনও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরিতে ছিলো সায়াহ্ন বেলায়, তখন আমি আর সে ছিলাম আমাদের পরিচিত নগরীতে। বৃষ্টি যতটা না উপভোগ করিতেছিলাম ততোধিক উপভোগ করিতেছিলাম তাকে তাহার পাশে দাড়িয়ে, খেলাঘরের ছাউনির নিচে। মৃদু আলাপন চলিতে ছিলো দুজনের, পাশাপাশি থাকা জনতার ভিড়ে। তাহারাও বৃষ্টির ধারা গায়ে মাখিবে না বলে দোকানিতে ভিড় জমিয়ে ছিলো। পাশে বসিয়াছিল চায়ের জগ হাতে লইয়া এক বয়স্কলোক।

আমি ওকে বলিলাম, এই মুহূর্তে চা খাইতে পারলে মন্দ হতো না।

ও বলিল, আপনি চা খাবেন?

আমি বলিলাম, আমি একা খাবো কেন, দুজনেই খাওয়া যাক।

ভাগ্যিস অন-টাইম গ্লাসও রহিয়াছিলো চাওয়ালার নিকটে, ও আবার বাহিরের কোন গ্লাসে কোন কিছু পান করিতে অনভ্যস্ত। চা খাইতে তাহার বিশেষ কোন আপত্তি রহিলো না আর। আমরা দুজন চা খাইতেছিলাম বর্ষণমুখর সন্ধ্যার আমেজে। তখন নব নব মধুর সংযোগ, মেপে মেপে বাক্যব্যয়, লাজুকতা, রক্ষণশীল দায়িত্ববোধ সবই চলিতেছিলো আমাদের মাঝে। সত্য বলিতে এমন মুহূর্ত আমার জীবনে ওটাই প্রথম আসিয়াছিলো, কোন তরুণীর সহিত একান্ত সন্ধ্যা পার করিতেছি তাহার অতি আপনজন হয়ে।

বলিলাম, চলো বৃষ্টিতে ভেজা যাক! ওর না ছিলো না, যদিও আমি শুধু বলার জন্যই কথাটি বলিয়াছিলাম। পরিশেষে বৃষ্টি থামিয়াছিলো। কিছুক্ষণ পরে আমাকে এক প্রসাধনী বিপণীতে লইয়া গেলো তাহার বদনের বিশেষ ক্রিম কিনার জন্য। ওর সহিত সময় পার করিতে বেশ ভালোই লাগিতেছিলো আমার, বিরক্তি আসিবার কথা নয়, কিন্তু যখন ও ওর মুখের প্রসাধনী ক্রয়ের জন্য কিয়ৎক্ষণ দোকানে ব্যয় করিতেছিলো আমার যেন আর তর সহিতেছিলো না। আমার কিঞ্চিৎ অস্থিরতা বুঝি ও ঠাওর করিতে পারিয়াছিল। তাই দ্রুত প্রস্থান করিলো আমাকে নিয়ে।

অন্যদিকে আমার বাড়ি ফিরিবার তাগিদ, সন্ধ্যা শেষে রাতের আধার আরো গাঢ় হচ্ছে কিন্তু শহরে তা কেবা গায়ে মাখে।

তাহার হ্যাঁ সূচক সম্মতি পাইবার উপলক্ষে গভীর আবেগ মিশ্রিত নম্রস্বরে বলিলাম, আমি বহুদিন রিক্সায় উঠিনি। শেষবার যখন রিক্সায় চড়িয়াছিলাম তখন আমি ছিলাম রাজশাহীতে। আজকে কি আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছিয়ে দিতে পারি?

ও খুব সহজেই শাঁই দিলো, আমরা রিক্সায় উঠিলাম। অনেকটা নিরবতা পালন দুজনের। হয়তোবা সে’ও আমার মতো আশা করিয়াছিলো, ও আগে কথা বলুক….। কি যেন আনমনে ভাবিতেছিলো, আমি আঁড়চোখে তাহার মুখখানা প্রত্যক্ষ করিলাম দু’দন্ড। কিঞ্চিৎ হাস্যরেখা চঞ্চুতে লইয়া পরক্ষণে বলিলো, নিরব হয়ে আছেন যে।

মৃদু হাসিয়া বলিলাম, কোন এক লেখকের ফেসবুক বায়োতে পড়েছিলাম, “এক পৃথিবী লিখবো বলে একটা খাতাও শেষ করিনি।” আমিও তাই, অনেক কথা বলবো বলে একটা কথাও শুরু করিনি!

ও কিছুটা বিস্ময়াভিভূত হইয়া বলিলো, বলেন, শুনি।

আমি বলিলাম, আচ্ছা যায়হোক, আজকে সারারাত রিক্সায় ঘুরে বেড়ালে কেমন হয়?

ওহ সহসাই সম্মতির সহিত বলিলো, ভালোই হয়, কিন্তু কোথায় কোথায় ঘুরবেন? দু’এক ঘন্টার মধ্যেই তো শহরের সবকিছু ঘুরে দেখা হয়ে যাবে।

আমিঃ কোন এক অজানার পানে হারিয়ে গেলে খুব বেশি মন্দ হবে কি?

ওঃ তাইবলে এই রিক্সায় করে?

আমিঃ মন্দ কি, ধীরে ধীরে না হয় হারায়ে গেলাম।

পথটা সহজেই শেষ হলে কি হারানোর মজাটা আর থাকে? গুণগুণ করিয়া গাহিলাম, এই পথ যদি না শেষ হয়……

এতক্ষণে ওর আঙিনার চলিয়া আসিয়াছি। পথ বুঝি আমাদের একসাথে রাখিতে চাহিল না, তাই এতটা নিষ্ঠুরতা দেখাইলো, আরো কিছুক্ষণ না হয় ওর সঙ্গে গল্প করিতাম! হায়রে দূরত্ব, তুই এতটা সংকীর্ণ আজ না হয় নাহিবা হইতিস!

আমাকে বিদায় জানাইয়া ও বাসার পানে চলিয়া গেলো। ওর দিকে অপলকে চাহিয়া রইলাম। কিন্তু ও আমার প্রতি আর ফিরিয়া তাকাইলো না।

বাড়ি ফিরিবার পথে ও আমার খোঁজ নিচ্ছিলো, কতদূরে পৌঁছালাম আমি। আমি ম্যাসেজে লিখিলাম, যাওয়ার বেলায় একবারও আমার দিকে তাকাইলে না?

ও বললো, রাস্তায় লোকজন ছিলো, তারা কি ভাবতো?

আরও কিছুক্ষণ থাকলে ভালোই হতো, এখন কেমন জানি খারাপ লাগছে তাড়াহুড়ো করেই সময়টা গেলো।

ও বললো, আপনিই তো তাড়াহুড়ো করছিলেন বাড়ি যাওয়ার জন্যে।

ভাবিলাম, তা-ও কথা মন্দ না দোষটা একান্ত আমারই। অনভিজ্ঞতা আর অনভ্যস্ততার ফল বুঝি।

ইহার পরে ধীরে ধীরে দুজনের অনেক বেশি ঘনিষ্ঠ হওয়া, একে অপরকে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া, এছাড়াও…..

ইহা নাতিদীর্ঘ অতীতের ঘটনা, প্রেমের প্রারম্ভিক উপাখ্যান বলিলে ভুল হইবে না।

আজিকেও বৃষ্টি হইতেছে, আমি সেই একই শহরের লাইব্রেরীতে বসে। যতটুকু জানিতে পারিয়াছি আজই তাহার পরীক্ষা শেষ হইবে, কিন্তু আমার সহিত তাহার আর দেখা হইবে না। অথচ আমার ফাইনাল ইয়ারের প্রায় প্রতিটা পরীক্ষা শেষে ও হাজির হইতো হিজাবে ঢাকা চাঁদনি বদনের একগাল চাপা হাসি নিয়ে! দীর্ঘ চারঘন্টার পরীক্ষা শেষে একরাশ অবসাদ দূরিভূত করিতাম তাহার প্রতি মুগ্ধতায় চেয়ে থেকে।

কিন্তু আজ দুজনের দূরত্বটা কুমেরু সুমেরু সম, যদিওবা না চাহিতে ভাগ্যক্রমে সন্নিকটস্থ হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয় তথাপি দুজন দুজনের অবস্থান নিরূপণ করিতে পারিলে চুম্বকের বিপরীত মুখী বিকর্ষণে মত তড়িৎ গতিতে স্থানচ্যুত হইতে হয়। কিন্তু আজ বড় অসহায়বোধ হইতেছে আমার, ভাগ্যরেখা এমন বিপথগামী না হইলেও পারিত। এতক্ষণে এই বইঘরে আমার সহিত সঙ্গ দিতো সে। বৃষ্টিরধারায় না ভিজিয়াও সিক্ত হইতাম দুজনে পাশাপাশি অবস্থানে। অজানা সুখানুভূতি দোলা দিয়ে যাইতো দুজনার মনে, ইহারপরে চারচোখের অনিমিলীত মিলন ঘটিত যাহার রেশ অন্তরকে স্বর্গলোকের হাওয়ায় ধাবিত করিত কিছুটা মুহূর্ত।

আমার ঘনিষ্ঠ যে সব বন্ধুদের কথা ও জানিতে পারিয়াছিল কিংবা আমি বলিয়াছিলাম বিশেষ কোন ঘটনার সূত্রধরে, তাহাদের মধ্যে কেউ তাহার ভাতৃসম, অনেক আপনজন বনিয়া গিয়াছে ইতোপূর্বে। শুনেথাকি তাহার যে কোন প্রয়োজনে অপ্রয়োজনে আমার বিশেষ সেই বন্ধুর উপস্থিতি অবশ্যম্ভাবী হইয়া যায়।

যে কিনা আমার অভ্যাসে পরিণত হইয়াছিল, যাহার সঙ্গে নিত্যদিনের আলাপচারিতায় আমাদের নৈমিত্তিক কর্মকান্ড সম্পাদনা হইতো এখন সেই প্রিয় মানুষের খোঁজ-খবর নিতে আমার ঐ বন্ধুর দ্বারস্থ হইতে হয়, ইহার থেকে পরিতাপের বিষয় বুঝি সংসারে কমই রহিয়াছে!

বৃষ্টিরধারা এখন একটু বিরতি লইয়াছে, আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিলাম। বাসের সিটে বসিয়া জানালার ধারে বিষন্ন মনে চাহিয়া রয়েছিলাম। দেখিলাম একঝাঁক বলাকা উড়িয়া গেলো ঈশানকোণে, কিয়ৎক্ষণ পরে নিঃসঙ্গতার ডানায় ভরদিয়ে একাকী উড়িয়াগেলো আরেকটা সাদা বলাকা। ও যেন বলাকা নই, বাসভর্তি লোকের ভিতরে আমি যেমন নিঃসঙ্গ অসহায় একযাত্রী, আমার হিয়া বুঝি ওই বলাকারূপে অচিনের পানে পাড়ি দিচ্ছে। তন্মুহূর্তে কে যেন একটা গান বিষাদের সুরে গাহিতেছিলো…..

“যে ছিল দৃষ্টির সীমানায়

যে ছিল হৃদয়ের আঙিনায়

সে হারালো কোথায়

কোন দূর অজানায়

সেই চেনা মুখ কতদিন দেখিনি

তার চোখে চেয়ে স্বপ্ন আঁকিনি….!

যতখানি সুখ দিয়েছিলো

তার বেশি ব্যাথা দিয়ে গেল

স্মৃতি তাই আমারে কাঁদায়….!”

✍️০১ অগ্রহায়ণ ১৪৩০

RELATED ARTICLES

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে

- Advertisment -
Google search engine

Most Popular

Recent Comments