একজন সফল স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প
মোঃ শামীম হোসেন
মানুষ হিসেবে প্রত্যেকের ছোট বা বড়ো একটা স্বপ্ন থাকে। স্বপ্ন নিয়েই মানুষ বেঁচে আছে। কঠিন পরিশ্রম এবং সঠিক অধ্যবসায়ের অভাবে সব স্বপ্ন পূরণ হয় না। সঠিক পরিকল্পনা এবং দায়িত্ব অবহেলার কারণে স্বপ্ন, স্বপ্নই থেকে যায়।
আমি এমনই একজন স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প বলবো যার সঠিক সিদ্ধান্ত এবং দায়িত্ব জ্ঞানের কারণে আজ তিনি সফলতার শীর্ষে অবস্থান করছেন। তিনি যে স্বপ্ন নিয়ে পথ চলেছেন আজ সেটা বাস্তবে রুপ নিয়েছে।
আমার গল্পের নায়ক মোঃ মনজুরুল আলম ( লিটু), অধ্যক্ষ, তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজ, চৌগাছা, যশোর। তিনি যশোর জেলার অন্তর্গত চৌগাছা উপজেলার হাকিমপুর ইউনিয়নের যাত্রাপুর নামক এক সুশীতল গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৃত মোঃ সিরাজুল ইসলাম। তার সাত ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি চতুর্থ।
লেখা- পড়া শেষ করে এলাকায় এসে তিনি শুনতে পেলেন, এলাকার শিক্ষা বঞ্চিত মানুষের জন্য একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবে। এলাকার গণ্য – মান্য ব্যক্তিবর্গের সাথে তিনি মিলিত হয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন এবিসিডি কলেজ। তিনি সেখানে একজন প্রভাষক হিসাবে যোগদান করলেন। অল্প কিছু দিনের মধ্যে কলেজটি এমপিও ভুক্ত হয়ে গেল। মনজুরুল আলম স্যারের ও বেতন ভাতা চালু হলো।
এমনই এক সময় চৌগাছা পৌরসভা গঠিত হলে, পৌরসভার মধ্যে একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা তার মাথায় ঢুকলো। যেই চিন্তা সেই কাজ। দক্ষিণ বঙ্গের উন্নয়নের কারিগর সাবেক প্রয়াত মন্ত্রী জনাব তরিকুল ইসলামকে ভালোবেসে তাঁর নামে স্থানীয় গণ্য – মান্য ব্যক্তিবর্গের সহায়তায় ২০০৬ সালে চৌগাছা – কোটচাঁদপুর সড়কে একেবারে পৌরসভার শেষ সীমানা ঘেঁষে প্রতিষ্ঠা করলেন তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজ। চাকরি যেখানে সোনার হরিণ সেখানে সরকারি বেতন ভুক্ত কলেজ থেকে ইস্তফা দিয়ে তিনি নিজের করা কলেজে আত্মনিয়োগ করলেন। বিনা পারিশ্রমিকে কিছু মেধাবী শিক্ষিত মানুষকে প্রভাষক হিসাবে নিয়োগ দিয়ে কলেজের যাত্রা শুরু করলেন। কলেজ প্রতিষ্ঠার বছরই মাননীয় সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের দল ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর থেকে কলেজটি পড়ে যায় রাজনৈতিক রোষানলে। সকলের মুখে মুখে শোনা যায় তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজ আর আলোর মুখ দেখবে না।
মনজুরুল আলম স্যারের অনেক সহযোদ্ধা আশাহত হয়ে জীবীকার প্রয়োজনে অন্য কাজ খুঁজে নিলেন। এতে তিনি সামান্য মানসিক কষ্ট পেলেও মনোবল হারালেন না। তিনি তার কাজ উদ্যম গতিতে চালাতে থাকলেন।
কোনো প্রভাষক, কর্মচারী সরকারি অনুদান না পেয়েও মনজুরুল আলম স্যারের অনুপ্রেরণায় কোনো ছাত্র – ছাত্রীর পড়াশোনা বিঘ্নিত হতে দেননি। কলেজে এসে কেউ বুঝতে পারিনি এটা একটা ননএমপিও কলেজ। তিনি কলেজের পরিধি আরও বাড়াতে থাকলেন, চালু করলেন এইচএসসি উন্মুক্ত প্রোগ্রাম। এর পরের বছর চালু করা হলো দুইটি ট্রেড নিয়ে ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শাখা। একই সময়ে প্রতিষ্ঠিত যেখানে অন্যান্য ননএমপিও প্রতিষ্ঠান বন্ধের দারপ্রান্তে সেখানে মনজুরুল আলম স্যার নিজের কলেজকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন উচ্চ থেকে উচ্চতর স্থানে।
এমনই এক সময় মানবতার ফেরিওয়ালা খ্যাত জনাব মোঃ হাসানুজ্জামান রায়হান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ডিভাইন গ্রুপ লিমিটেড, চৌগাছার ননএমপিও শিক্ষক, কর্মচারীদের জন্য আর্থিক সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন। এতে তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজ আরও উদ্যম গতিতে পথ চলার শক্তি পেল।
আমার দেখা প্রতিষ্ঠানের জন্য পরিশ্রমী ব্যক্তি হলেন অধ্যক্ষ মোঃ মনজুরুল আলম। একবার কলেজের গুরুত্বপূর্ণ কাজ নিয়ে যেতে হবে ঢাকায়। একইদিন অধ্যক্ষ স্যারের স্ত্রী,সন্তান প্রসবের জন্য হাসপাতালে ভর্তি। তিনি স্ত্রীকে সময় না দিয়ে চলে গেলেন ঢাকা। তিনদিন পরে যখন ফিরে আসলেন, বাস থেকে নেমেই ঢাকা থেকে ফোন আসলো এখনই ঢাকা আসতে হবে, তিনি স্ত্রী – সন্তানের মুখ না দেখে ফিরতি বাসে করে আবার চলে গেলেন ঢাকা। কাজ শেষ করে সোজা কলেজে। তার কাছে স্ত্রী – সন্তানের থেকে কলেজ অনেক বড়ো মনে হয়েছে। এরকম আরও অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে, যে তিনি তার পরিবারের চেয়ে কলেজের প্রতি সময় দিয়েছেন বেশি।
কলেজের সাফল্য ঃ
কলেজ প্রতিষ্ঠিত – ২০০৬ সালে। মোঃ মনজুরুল আলম স্যারের সঠিক নেতৃত্ব ও তত্বাবধানের কারণে কলেজের সকল সম্মানিত প্রভাষক এবং কর্মচারী হয়ে উঠেছেন অত্যন্ত দক্ষ ও কর্তব্যপরায়ণ। যা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাছে ঈর্ষা নীয়। এর ফলশ্রুতিতে কলেজটি প্রতিষ্ঠার পর হতে আজ পর্যন্ত তিনবারের মতো যশোর শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে সেরা দশে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে। আজ এই কলেজের শিক্ষার্থী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সহ দেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে।
ছাত্র – ছাত্রীঃ
একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে – বিজ্ঞান + ব্যবসায় শিক্ষা + মানবিক শাখায় প্রায় চারশত ছাত্র – ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শাখায় – একাদশ + দ্বাদশ শ্রেণিতে প্রায় দুই শত ছাত্র -ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
এইচএসসি উন্মুক্ত প্রোগ্রামে প্রায় তিনশত ছাত্র – ছাত্রী পড়াশোনা করছে।
কলেজের আয়তন ঃ
তিল তিল করে তরিকুল ইসলাম পৌর কলেজে প্রায় ৬.৫ বিঘা জমিতে পরিণত হয়েছে। চমৎকার প্রাকৃতিক পরিবেশ দ্বারা বেষ্টিত সকলের দৃষ্টি কাড়বে বলে আমার বিশ্বাস।
এমপিও ভুক্ত ঃ
২০১৯ সালে মাননীয় শিক্ষা বান্ধব প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক বিবেচনা বাদ দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে এমপিও ঘোষণা করলে, কলেজটি এমপিও ভুক্ত হয়। এজন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।
২০২২ সালে উক্ত কলেজের ব্যবসায় ব্যবস্থাপনা শাখার দুটি ট্রেড এমপিও ভুক্ত করা হয়। এজন্য ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করছি।
একজন মানুষের কতেটা ধৈর্য, ও দক্ষতা থাকলে এমন একটা কলেজ উপহার দেওয়া যায়। মনজুরল আলম স্যার তার বাস্তব উদাহরণ।
মনজুরল আলম স্যারের, আর মাত্র একটি স্বপ্ন পূরণ হতে বাকি আছে, সেটি হলো কলজটিকে স্নাতক পর্যায়ে উন্নিত করা। আর সেটা হলে তিনি একজন পরিপূর্ণ সফল স্বপ্নদ্রষ্টা হিসাবে সকলের নিকট স্থান করে নিবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। আমরা তার উত্তরোত্তর সাফল্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করছি।


