রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ
রহস্যমায়ের মুকুটমনি
কলমে : রাজ সেন
29.09.2023
চন্দ্রমৌলির ডাক্তারী পরীক্ষার ফলাফল যেদিন বেরোলো মহালয়ের তখনও দুদিন বাকি আছে . চন্দ্রমৌলি ভালোভাবে পাশ করেছে শুনে তার বৃদ্ধ ঠাকুরদা যাজ্ঞসেনী পাঠক মহাশয় আনন্দ আর ধরে রাখতে পারছেন না .
চন্দ্রমৌলির বাবা আর্মির ডাক্তার,কর্নেল যতীনমৌলি পাঠক অবসর গ্রহণের পর পাকাপাকিভাবে কলকাতায় ফিরে আসছেন মহালয়ের দুদিন পরেই .
চাকরির শেষ কয়েকটা বছর তিনি দিল্লির কাছে আগ্রার সেনাছাউনিতে ছিলেন .তার বাড়ি ফেরা আর দিন চারেকের অপেক্ষা . ফোনে ছেলের পাশের খবর পেয়ে তিনিও যার-পর-নাই আনন্দিত .
কুমোরটুলির পটুয়া পাড়ার পাশেই তাদের পৈতৃক বাড়িতে তাই সাজ সাজ রব পড়ে গেছে . বাড়ির পুজোতে খুব হৈচৈ হবে এবছর .যাজ্ঞসেনী বাবুর এক ছেলে ও এক মেয়ে . মেয়ে মধুছন্দার বিয়ে হয়েছে কাছেই বাগবাজারে .তার স্বামী শাক্যসেন
ক্রিমিনাল ল-ইয়ার . তাদের ছেলে রঙ্গন প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটিতে ফিজিক্সে মাস্টার্স করছে .প্রথম বর্ষের ছাত্র সে .
রঙ্গন বয়সে চন্দ্রমৌলির থেকে দুই বছরের ছোট হলেও দুই ভাইয়ের মধ্যে সদ্ভাব খুব .যাজ্ঞসেনী বাবু কুমোরটুলি অঞ্চলের নামকরা হোমিওপ্যাথি ডাক্তার. বয়স প্রায় পঁচাশি বছর .যদিও বয়সের তুলনায় তিনি এখনো বেশ শক্তপোক্ত .তবে রোগী দেখা অনেক কমিয়ে দিয়েছেন .সকাল সন্ধ্যায় 10 জন করে রুগী দেখেন তিনি .তাঁর দুই অ্যাসিস্ট্যান্ট মনিবাবু ও রমেনবাবু ওষুধ তৈরি করে রুগীদের দেন .দেখাতে পয়সা লাগে না ,শুধু ওষুধের দামটুকু দিতে হয় .তাঁর স্ত্রী সোমলতাদেবী বার্ধক্যজনিত কারণে তাঁর তিনতলার ঘর থেকে নিচে প্রায় নামেন না .পুত্রবধূ অর্থাৎ যতীনমৌলির স্ত্রী অহনা নিজেই তাঁর দেখাশোনা করেন .
বাড়ির তিনতলাতেই রান্নাঘর .তার পাশের বড়ো ঘরটিতে যাজ্ঞসেনী বাবু ও সোমলতাদেবী থাকেন. ঘরের ভেতর দিয়েই তাদের বাথরুমে যাওয়া যায় .
দুতলার বড়ো ঘরটি ভাগ করা দুভাগে .একভাগ হলো চন্দ্রমৌলির ঘর ও আরেকভাগ তার বাবা-মা যতীনমৌলি ও অহনার .বাড়ির একতলায় ঠাকুরদালান ও চণ্ডীমণ্ডপ.পুজোর কটা দিন মধুছন্দারা এসে চন্দ্রমৌলির ঘরেই থাকে , যদিও অনেকটা সময় তার তিনতলায় মায়ের ঘরেই কেটে যায়. একতলার গেস্ট রুমেও তারা থাকে , তবে পুজোর সময় ওপরে নীচে করে কেটে যায় .অন্যান্য আত্মীয়স্বজনেরা এলে গেস্ট রুমে তাদের বসার ব্যবস্থা থাকে .
ঠাকুর তৈরি হয় পাশেই পটুয়াপাড়ায় .ঠাকুর তৈরি করেন তিমিরবরণ পাল মহাশয় .বিগত প্রায় একশো বছর তারাই পাঠকবাড়ির দুর্গাঠাকুর তৈরি করে আসছেন .ওনার আগে ওনার পিতা গঙ্গাধর পাল মহাশয় এই বাড়ির ঠাকুর তৈরি করতেন .তিমিরবাবু ও যাজ্ঞসেনী বাবু ছোটবেলাকার বন্ধু .তাঁরা সারদাচরণ স্কুলে ছোট থেকে একসঙ্গে পড়াশোনা করেছেন .
তিমিরবাবু পটুয়াপাড়ার ভেতরেই থাকেন . ঠাকুর তৈরি হবার সময়টাতে যাজ্ঞসেনী বাবু ঘন ঘন তিমিরবরণের কাছে দেখতে যান তাদের ঠাকুর কতদূর হলো !
মহালয়ের আগের দিন রাতে চেম্বারের পর তিমিরবরণের কাছে গিয়েছিলেন তিনি .সেদিন অনেকক্ষণ বন্ধুর সঙ্গে গল্পগুজব করে বাড়ি ফিরে আসেন তিনি .ঠাকুর দেখে জানিয়ে গেলেন পরদিন এসে চক্ষুদান দেখে সব সম্পন্ন করে ঠাকুর নিয়ে
যাবেন .
পরদিন সকালে চন্দ্রমৌলি ও রঙ্গন দুই নাতিকে সঙ্গে নিয়ে যাজ্ঞসেনীবাবু স্বয়ং হাজির তিমিরবরণের দরজায় .বললেন -” কইরে ? এবার চোখটা আঁক দেখি, দেখে দুচোখ জুড়োই .”
তিমিরবরণের চোখ আঁকা হলে বড়ো তৃপ্তি সহকারে সব বায়না মিটিয়ে লোকেদের ঘাড়ে ঠাকুর নিয়ে দুই নাতিকে সঙ্গে করে বাড়ি ফিরলেন যাজ্ঞসেনীবাবু. যাবার আগে তিমিরবাবুকে বলে গেলেন
– ” ষষ্ঠীর বোধনের আগে ঠাকুরের গায়ের গয়না তুই পরিয়ে দিয়ে আসবি .সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এই ব্যবস্থা চলে আসছে .আগে সোমলতা থাকতো তোর সঙ্গে , এখন সে উপায়ও নেই .সব ভার তোর ওপরেই রইলো , বুঝলি তো ! ” তিমিরবাবু উত্তর দিলেন – ” আরে হ্যাঁ , হ্যাঁ ! চিন্তা করিসনা , এ আবার বলতে হবে নাকি ? “
(চলবে)


