মোঃ জাহিদুর রহমান ।।
বাঙালী ও বাংলাদেশের ইতিহাস যেমন আনন্দ বেদনার, আলো-আঁধারের, আশা-নিরাশার, জোয়ার-ভাটার, ঘাত-প্রতিঘাত ও সংগ্রামের। বাংলার ইতিহাস শাসক আর শোষিতের। যুগে যুগে এদেশে মীর জাফর, রায়দুর্লভ, জগৎশেঠ, ঘোষটি বেগমদের ষড়যন্ত্রে জর্জরিত। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের ভাষা সাহিত্য সংস্কৃতিতে বার বার আঘাত হানার চেষ্টা করেছে দুর্বৃত্তরা। সেন, পাঠান, মোঘল, ইংরেজ পাকিস্তানীরা আমাদের ভাষা কেড়ে নিয়ে তাদের ভাষা চাপাতে চেয়েছিল।
আত্মপ্রত্যায়ী সংগ্রামীজাতী বাঙালী সেনদের সংস্কৃত, পাঠান, মোঘলদের, ফার্সি, ইংরেজদের ইংরেজী এবং নরঘাতক পাকিস্তানীদের উর্দূ গ্রহন করেনি, বুকের রক্ত দিয়ে তারা বাংলা ভাষাকে নিজের করে নিয়েছে।
এদেশের মানুষ যেমন মীর জাফর, মোস্তাককে দেখেছে তেমনি দেখেছে বারভূইয়া, তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, শেরেবাংলা, ভাসানী, সোহরাওয়ার্দী। জাতী হিসাবে এই মানুষগুলো ছিল আত্মপ্রত্যায়ী সংগ্রামে উজ্জ্বল নক্ষত্র।
এই সংগ্রামের ইতিহাস ধরে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তারুণ্য যৌবনের সমস্ত কিছু বিসর্জন দিয়ে জেল জুলুম অত্যাচার এবং ফাঁসির মঞ্চকে উপেক্ষা করে মৃত্যুকে সামনে দেখে নির্ভয়ে বাঙালী আত্মপ্রত্যয়ী মনোভাবে সংগ্রাম বুকে ধারন করে স্বাধীনতার লাল সূর্যকে এনে দিয়েছিলেন।
মেহনতি, বিধস্ত, জর্জরিত, বঞ্চিত, স্বাধীনতা পিপাসী, ক্ষুদাপীড়িত অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে যারা ধন্য হয়েছেন, যাদের পৃথিবী ও পৃথিবীর মানুষ স্বরণ করেন, তারা হলেন লেনিন, জর্জ ওয়াশিংটন, আব্রাহাম লিংকন, মহাত্মা গান্ধী, ভিয়েত নামের হো চি মিন, কঙ্গোর লৌহ মানব লুলুম্বা, কেনিয়ার জামো কেনিয়াত্তা, কিউবার ফিডোল কাষ্ট্রো, আলজেরিয়ার বেনবিল্লাহ্, রাশিয়ার জোসেফ স্ট্যালিন। সেই তেজদ্বীপ্ত বিপ্লবী মানুষদের সাথে তুলনা করা যায়, মা মাটি মানুষের নেতা বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামী চেতনার সংগ্রামী জীবন।
এই মহান নেতাকে যখন বৃটিশ সাংবাদিক ডেভিড ফ্রষ্ট প্রশ্ন করেছিলেন What is Your Qualification বঙ্গ বন্ধু বলেছিলেন ‘I Love My People’ তিনি আবার প্রশ্ন করেছিলেন ‘What is Your Disqualification’ বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন-‘I Love Them Too Much’।
তিনি বাংলা ও বাঙালীর জন্য কত নির্যাতন সহ্য করেছেন। বঙ্গবন্ধুর বিদ্রোহী সত্তা বিদ্রোহী বাঙালীর দর্পন। বঙ্গবন্ধু, জন এফ ক্যানিডির একটি উক্তি প্রায়ই বলতেন- ‘Ask Not What Your Country Do For You, Ask What You Can Do For Your Country’
বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানীর ২৪ বছর রাজনীতিতে ১২ বছর কারগারে বন্দি ছিলেন। দু দু’বার ফাঁসির মঞ্চ থেকে ফিরে এসেছেন। তিনি কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে দেশের মাটিতে পা রেখে স্বল্প সময়ে যুদ্ধ বিধস্ত বাংলাদেশ পূর্নগঠনের জন্য ঝাপিয়ে পড়েন, তিনি আমাদের জাতীয় পতাকা, জাতীয় সংগীত, এবং সংবিধান উপহার দেন, তিনি ভারতে আশ্রয়রত এক কোটি মানুষকে পূর্নবাসন, ত্রিশ লক্ষ শহীদ পরিবার ও দুই লক্ষ নির্যাতিত মা বোনের পূর্নবাসন, যুদ্ধ বিধস্ত সড়ক, পুল, বিদুৎ কেন্দ্র, টেলিফোন একসেঞ্জ পুর্ননির্মান করেন। তিনি ৪৬৭টি সেতু নির্মান ও মেরামত সাতটি ফেরি, ভৈরব হার্ডিঞ্জ ব্রিজ পূর্ননির্মান, ১৮৫১টি রেল ওয়াগেন, ৬০৫টি রেল ষ্টেশন, প্রাথমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ, শিল্প, কল-কারখানা, ব্যাংক বীমা জাতীয়করণসহ মাদ্রাসা বোর্ড, ইসলামী ফাউন্ডেশন, টঙ্গীতে বিশ্বইস্তেমা, কাকরাইল মসজিদের জন্য জমি বরাদ্দ দিয়ে ছিলেন। পাকিস্তানীদের পরিত্যক্ত ৫০০ শিল্প প্রতিষ্ঠান জাতীয়করণ ও উৎপাদনক্ষম করে লক্ষ লক্ষ শ্রমিকের কর্মসংস্থান করেন। তার উন্নয়ন ফিরিস্তি অনেক বড় যা বর্ণনা করা অল্প সময়ে স্বল্প পরিসরে অকল্পনীয়।
লন্ডনের গার্ডিয়ান পত্রিকায় বঙ্গবন্ধুকে মুকুটহীন সম্রাট বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু বাঙালী জাতীর লালিত স্বপ্ন জাগিয়ে তুলেছিলেন ৭ই মার্চ ভাষনের মাধ্যমে। এই ভাষনে তিনি মুক্তির আহবান, বাঙালী জাতীকে সু-সংগঠিত করা, সচেতনার উন্মেষ ঘাটানো, যুদ্ধ প্রতিরোধ ব্যবস্থা করা এবং স্বাধীনতার গ্রীন সিগনাল দিয়েছিলেন। বাঙালীর হাজার বছরের চিন্তা চেতনার মাহাকাব্য সেদিন বঙ্গবন্ধুর ১৮ মিনিটের ভাষনে উঠে এসেছিল। “এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম…. প্রত্যেক ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তোল, এ ছিল দক্ষ সেনাপতি, নিপুন রাজনীতিকের যুক্তিপূর্ণ ও দূরদর্শী ভাষন।
এটাই শেষ নয়, তিনি পাকিস্তানীদের হাতে বন্দি হওয়ার আগে স্বাধীনতার ঘোষনা দেন, যা প্রমানিত সত্য, পাকিস্তানী বার্তা বিভাগের প্রধান মেজর সিদ্দিক সালিকের গ্রন্থ ‘Witness to Surrender’ তিনি লিখেছেন মুজিবের ক্ষীণ কন্ঠের বার্তা আমার ওয়ারলেস সেট ধরা পড়ে। সেটা হল ‘This May be My Last Message From to day Bangalash is Independent….|
বাঙলীর প্রাণ ভোমরা ইতিহাসের মহানায়ক যার যৌবনের উত্তাপ দিয়ে এই বাংলাদেশ উপহার দিয়েছিলেন সেই দরদি মানুষটি কি নিদারুণ অবহেলায় কি পৌশাচিক নির্মমতায় হত্যা করা হয়েছিল। ভাবতে মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে ওঠে মানুষের ভালোবাসা মমতাকে উপেক্ষা করে ব্যথাতুর ও শোকাতুর মানুষদের বঙ্গবন্ধুর জানাজায় অংশগ্রহন করতে দেয়নি, মানবতার শত্রু বাংলার চির শত্রু কুলাংগার মীর জাফরের উত্তরসুরী মোস্তাক গংরা।
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙলী, বাঙলী জাতির পিতা, দেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, পৃথিবীর রাষ্ট্র নায়কদের মত তাঁর কফিন জাতীয় পতাকায় আচ্ছাদিত হয় নাই, ফুলে ফুলে ভরে ওঠেনি তার কফিন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় বেজে ওঠেনি বিউগলের শেষ বিদায়ের করুন সুর। অদুরে দাঁড়িয়ে অসহায় আর্তনাদে নিরবে চোখের জল ফেলেছিল গ্রাম বাংলার মানুষ।
বঙ্গবন্ধু ব্যক্তি স্বার্থের উর্দ্ধে দাঁড়িয়ে বাংলা ও বাঙালীর কথা বলেছেন। বঙ্গবন্ধু ৭ই মার্চ এর ভাষনে এই কথা দিয়ে লেখা শেষ করব “ রক্ত যখন দিয়েছি রক্ত আরো দেব” জীবন দিয়ে জীবনের এই ধ্রব সত্য পালনে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত রেখে গেছে, তার বুকের রক্ত দিয়ে ধানমন্ডির ৩২ নং বাড়ির সিড়ি ভেজাননি, তার রক্ত দিয়ে সারা বাঙালীর লজ্জা, দুঃখ, বেদনাকে ভাসিয়ে ভিজায়ে একাকার করে গেছেন।
লেখকঃ
অবসর প্রাপ্ত অধ্যক্ষ. চৌগাছা সরকারী কলেজ, যশোর।


