আর কোনো ভোর নেই
আবু রাসেল
বিকেলের তপ্ত রোদ তখন কেবল মিইয়ে আসতে শুরু করেছে। ড্রয়িংরুমে বসে চা খাচ্ছিলেন রহমান সাহেব। হঠাৎ তাঁর মোবাইলটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে অপরিচিত একটা নম্বর। রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো এক অচেনা, অস্থির কণ্ঠস্বর, “হ্যালো, আপনি কি অনন্যার বাবা? হাইওয়ের পাশে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে…”
রহমান সাহেবের হাতের চায়ের কাপটা মেঝেতে পড়ে ভেঙে খানখান হয়ে গেল। বুকটা কেঁপে উঠল এক অজানা আশঙ্কায়। মাত্র ঘণ্টাখানেক আগেই তো তাঁর ১৫ বছরের মেয়ে অনন্যা বান্ধবীর বাসায় পড়ার নাম করে বের হয়েছিল।
ছুটে গেলেন হাইওয়ের দুর্ঘটনাস্থলে। সেখানে তখন উৎসুক মানুষের ভিড়। ভিড় ঠেলে সামনে এগোতেই রহমান সাহেবের পায়ের নিচের মাটি সরে গেল। রক্তে ভেজা রাস্তায় পড়ে আছে তাঁর একমাত্র আদরের সন্তান অনন্যা এবং তার পাশে ১৯ বছরের একটি ছেলে, আবির। পাশে দুমড়েমুচড়ে পড়ে আছে আবিরের বাবার দেওয়া নতুন ঝকঝকে মোটরসাইকেলটি। অনন্যার শখের আধুনিক পোশাকটি আজ ধুলো আর রক্তে মাখামাখি। যে বাহ্যিক রূপ আর আধুনিকতা নিয়ে সে মেতে থাকত, আজ তা নিথর, নীরব।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলছিলেন, “মেয়েটিই নাকি শখ করে জেদ ধরে মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছিল। ছেলেটি তাকে বারণ করেনি। গতি ছিল অতিরিক্ত, আর মোড় ঘোরার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সরাসরি এসে পড়ে বড় ট্রাকের নিচে।”
খবর পেয়ে ছুটে এলেন আবিরের বাবাও। তাঁর বুকফাটা আর্তনাদে চারপাশের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। তিনি নিজেকেই ক্ষমা করতে পারছিলেন না। আবিরের ১৯ বছর বয়সে পা দেওয়ার আনন্দে, ছেলের আবদার রাখতে গিয়ে মাত্র কয়েকদিন আগেই এই মোটরসাইকেলটি কিনে দিয়েছিলেন তিনি। ভেবেছিলেন, সন্তানকে খুশি করাই বাবার সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। কিন্তু আজ বুঝতে পারছেন, সেই ভালোবাসার আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক ভয়ানক অসতর্কতা।
অন্যদিকে রহমান সাহেবও স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিলেন তাঁর নিজের কথা। অনন্যাকে তিনি স্বাধীনতা দিয়েছিলেন, আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলার সব সুযোগ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সাথে মিশছে, কতটা নিরাপদে থাকছে—এই নজরদারির জায়গাটাতে তিনি বড্ড শিথিল ছিলেন। অতিরিক্ত আবেগ আর অন্ধ বিশ্বাসের চাদরে ঢেকে রেখেছিলেন নিজের দায়িত্ববোধকে।
আশেপাশের মানুষজন অনন্যার পোশাক আর তাদের এই অল্প বয়সের মেলামেশা নিয়ে নানা মন্তব্য করছিল। কিন্তু সেই মুহূর্তে পোশাকের শালীনতা বা বাহ্যিক অবয়বের চেয়েও বড় সত্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল দুটি হারিয়ে যাওয়া তাজা প্রাণ। আধুনিকতার নামে যে স্বাধীনতা তারা পেয়েছিল, দায়িত্ববোধের অভাবে তা রূপ নিয়েছে এক নির্মম ট্র্যাজেডিতে।
হাসপাতালের মর্গের সামনে যখন দুই পরিবারের অভিভাবকেরা মুখোমুখি হলেন, তখন কারও মুখে কোনো কথা ছিল না। শুধু ছিল চোখের জল আর এক অন্তহীন অপরাধবোধ। আবেগের বশে নেওয়া একটি সিদ্ধান্ত, সন্তানদের প্রতি নজরদারির অভাব আর সময়ের সামান্য অসচেতনতা আজ দুটি পরিবারকে সারাজীবনের মতো অন্ধকারের গহ্বরে ঠেলে দিল।
সন্ধ্যা নেমে এলো পৃথিবীর বুকে। কিন্তু দুই অভিভাবকের মনে যে অন্ধকার নামল, তার আর কোনো ভোর নেই। দুটি তরতাজা প্রাণ চলে গেল ওপাড়ে, আর এপাড়ে রেখে গেল এক চিরন্তন শিক্ষা—সন্তানকে শুধু ভালোবাসলেই হয় না, তাকে দায়িত্বশীল করে তোলা এবং তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই বাবা-মায়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।


