পীর বলুহ্ দেওয়ানের জীবন কাহিনী ও মেলার ইতিহাস

পীর বলুহ্ দেওয়ানের মেলা

0
189
পীর বলুহ্ এর রওজা শরীফ
পীর বলুহ্ এর রওজা শরীফ

ভারতীয় সীমান্তর্তী যশোর জেলার চৌগাছা উপজেলার অন্তর্গত ঐতিহ্যবাহী হাজরাখানা গ্রাম।এই গ্রামের পাশ দিযে যুগ যুগ ধরে বয়ে যাওয়া কপোতাক্ষ নদ । মহাকবি মাইকেল মধুসুদন দত্ত লিখেছেন যে, কপোতাক্ষ নদ মায়ের দূধের সমান।ইতিহাস সমৃদ্ধ সেই কপোতাক্ষ নদের পাশে উঁচু ঢিবির ওপর  পীরে কামেল বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফ অবস্থিত। উল্লেখ্য যে, বলুহ দেওয়ান (রহ.) মৃত্যুর পর এ অঞ্চলের তৎকালীন জমিদার কে.টি চৌধুরী তার রওজা এলাকায় সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য ১৫ শতাংশ জমি দান করেন। প্রায় তিনশত বছর ধরে উপজেলার হাজরাখানা গ্রামে কপোতাক্ষ নদের তীরে অবস্থিত পীরে কামেল বলুহ দেওয়ান (রহ.) এর রওজা শরীফকে ঘিরে বসে এই মেলা । স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মেলা পরিচালনা কমিটি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় প্রতি বাংলা সনের শেষ মঙ্গলবার আনুষ্ঠানিকভাবে মেলার শুরু হয়ে থাকে। তবে আসবাবপত্রসহ অন্যান্য দ্রব্যাদির বেচাকেনা শুরু হয়ে যায় আরও আগে থেকে। বিভিন্ন স্থান থেকে চিশতিয়া তরিকার গুরুরা মেলায় আসেন এবং পীরে কামেল বলুহ্ দেওয়ানের প্রতি ভক্তি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।  মেলার সময়ে হাজরাখানাসহ পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে পড়ে ব্যস্ততার ধুম। এ অঞ্চলের কয়েকটি গ্রামে ঈদে-পূজায় মেয়ে-জামাই দাওয়াত না করলেও মেলা উপলক্ষে দাওয়াত করার রেওয়াজ রয়েছে। যাকে ঘিরে এই মেলা তার সম্পর্কে রয়েছে নানা মিথসক্রিয়া। রয়েছে অলৌকিক নানা কাহিনীর বর্ণনা। যা, লোকমুখে প্রকাশ পায়। পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন।তিনি যা বলতেন তাই হতো। তার জন্ম-মৃত্যুসহ জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ছিল রহস্যে ঘেরা। আমরা জানি, মানুষের মাজার হয় একটি। কিন্তূ বলু দেওয়ানের মাজার দুই জায়গায়। একটি হলো চৌগাছার হাজরাখানা গ্রামে। আর একটি হলো ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার বড় ধোপাদী গ্রামে। প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার ওই দুই স্থানেই মেলা বসে। নানা কিংবদন্তী ঘটনা আছে তাঁকে নিয়ে। ইতিহাসে যতটুকু জানা যায়, পীর বলু দেওয়ানের জম্মস্থান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার দক্ষিণ প্রান্তে যশোরের চৌগাছা উপজেলার যাত্রাপুর গ্রামে।তার পিতার নাম ছুটি বিশ্বাস। শিশুকাল থেকে নানা রকম ঐশ্বরিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন বলু দেওয়ান। জানা যায়, বলু দেওয়ান মারা যায় তাঁর মাতৃকূলের স্থায়ী নিবাস চৌগাছার হাজরাখানা গ্রামে। এখানে তার মাজার আছে। কথিত আছে যে, একই দিন আবার যাত্রাপুর গ্রামের লোক দেখেন বলু দেওয়ান মারা গেছেন। তখন তাকে সমাহিত করা হয় যাত্রাপুরের পাশের গ্রাম ঝিনাদহ জেলার অন্তর্গত কালীগঞ্জ উজেলার ধোপাদি বাজারের পাশে। ধোপাদি গ্রামে বলু দেওয়ানের সমাধির পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত আছেন বলু দেওয়ানের পাঁচজন খাদেম, মান্দারী শাহ, বশির শাহ, আফসার শাহ, ফটিক শাহ ও জলিল শাহ। দুই মাজারকে ঘিরে মানুষ আপদে-বিপদে, রোগে-শোকে মানত করে। সেই মানত পূর্ণ হলে তারা মাজারে এসে হাঁস-মুরগী, ছাগল দিয়ে যান। ধোপাদি বাজারের পাশে তাঁর সমাধি ক্ষেত্রে রয়েছে দু’টি পুকুর ও একটি ফলের বাগান। বহু গভীর এই পুকুরের পানি কখনও শুকায়নি। অন্যদিকে আমরা যে স্থান থেকে কথা বলছি চৌগাছার কপোতাক্ষ নদীর পশ্চিমতীরে হাজরাখানা গ্রামে তার মাজারকে ঘিরে মেলায় হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। জাতীয় মেলার  তালিকায় যে, মেলার অবস্থান ২৯তম। প্রায় ৩শত বছর ধরে বাংলা সনের ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার শুরু হওয়া মেলা চলে সপ্তাহব্যাপী। আজও তার জন্মকাল সম্পর্কে সঠিক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। ভক্তদের মতে ‘তিনি ৩-৪ শ’ বছর আগে জন্মগ্রহণ করেন। তার নামে চৌগাছার হাজরাখানা পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) দাখিল মাদরাসার নামকরণ করা হয়েছে। এছাড়াও পীরে কামেল বলুহ দেওয়ানের নামে ভারতের কলকাতা ও নদীয়া, বাংলাদেশের চৌগাছার হাজরাখানাসহ বিভিন্ন স্থানে ৫২টি থান/ইবাদতগাহ আছে। যেখানে তার ভক্তরা বসে ইবাদত-বন্দেগি করেন। আরও উল্লেখ্য, বর্তমানে উপজেলার জিওলগাড়ি, পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার বড়-ধোপাধী গ্রামে তার থানে ছোট পরিসরে মেলা বসে থাকে। পীর বলুহ (রহ.) সম্পর্কে মিথ প্রচলিত আছে, তিনি ‘১০/১২ বছর বয়সে বাবার অনুমতিক্রমে পার্শ্ববর্তী গ্রামের ব্যাদন বিলের মাঠে গরু চরাচ্ছিলেন। গরু দিয়ে ক্ষেত নষ্ট করার অভিযোগে ক্ষেতের মালিক গরুগুলি ধরে খোয়াড়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে রওনা দিলে তিনি দেখে ফেলেন অতঃপর তিনি সব গরু বক বানিয়ে বটগাছে বসিয়ে রাখেন। বাবার মৃত্যুর পর ছোট্ট বলুহ তার মামার বাড়ি হাজরাখানায় চলে আসেন। পীরে কামেল বলুহ দেওয়ানের মামার আর্থিক অবস্থা ভাল না থাকায় তিনি অন্যের বাড়িতে দিন মজুরের কাজ করতেন। একদিন তার গৃহস্থ তাকে মাঠে গিয়ে সরিষা মাড়াই করতে বলেন, তিনি মাঠে গিয়ে সরিষা মাড়াই না করে সরিষার গাদায় আগুন ধরিয়ে দেন। সংবাদ শুনে গৃহস্থ মাঠে গিয়ে দেখে, সরিষার গাঁদায় আগুন জ্বলছে। তখন গৃহস্থ রাগান্বিত হলেও তিনি হাসতে হাসতে ছাই উড়িয়ে দেখিয়ে দেন সরিষা পোড়েনি। সরিষা দানা অক্ষত আছে। আরও কথিত আছে যে, একদিন তার মামি খেজুর রসের চুলায় জ্বাল দিতে বললে, তিনি জ্বালানির পরিবর্তে চুলায় পা ঢুকিয়ে আগুনে জ্বাল দিতে থাকেন। এতেও তার পায়ের কোনো ক্ষতি হয়নি। এমন সব অনেক অলৌকিক ঘটনার জন্ম দিতে থাকায় বলুহ দেওয়ান পীর আখ্যা পান । এসব অলৌকিক ঘটনা জানাজানি হয়ে যাওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বহু মানুষ তার কাছে এসে শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।

 অলৌকিক ঘটনারসমূহের প্রেক্ষিতে তার মৃত্যুর পর গ্রামাঞ্চলের মানুষ জটিল ও কঠিন রোগ থেকে মুক্তি পেতে তার নামে মানত করতে থাকে। মানত পরিশোধে প্রতি বছর ভাদ্র মাসের শেষ মঙ্গলবার হাজরাখানা গ্রামে অবস্থিত তার রওজা শরীফে গরু, ছাগল, হাঁস, মুরগি, নারকেল ও টাকাসহ নানা দ্রব্যাদি দিয়ে মানত শোধ করতে থাকে। সেখান থেকেই একসময় ভক্তদের প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা মেটানোর তাগিদ থেকেই গড়ে ওঠে পীর বলুহ দেওয়ান (রহ.) মেলা। এই মেলায় কাঠের আসবাবপত্র, হোটেল-বেকারি, গার্মেন্টস, প্রসাধনী ও শিশুদের খেলনা, মিষ্টির দোকান, নাগরদোলা, যাদু প্রদর্শনী, সার্কাস, স্টিল সামগ্রীসহ শতশত দোকান বসে।

দীর্ঘদিন থেকে স্বল্প পরিসরে মেলা হতে থাকলেও বিগত পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে চলছে জমজমাট মেলা। মেলা শুরু হয়ে ৩ থেকে সাত দিন মেলার আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও মেলা শুরুর ১৫/২০ দিন পূর্ব থেকে শেষের ১০/১২ দিন পর্যন্ত চলমান থাকে মেলার বেচাকেনা। মেলায় সারাদেশ থেকে ছোট-বড় ব্যবসায়ীরা আসেন ব্যবসা করতে। এ অঞ্চলের যশোর-ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা ও সাতক্ষীরা জেলা সহ বিভিন্ন জেলা হতে অবাল, বৃদ্ধা, বণিতা সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ আসেন মেলা দেখতে এবং মেলা থেকে আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী ক্রয়/বিক্রয় করতে। কপোতাক্ষ নদের তীর থেকে হাজরাখানা পীর বলুহ দেওয়ান দাখিল মাদরাসা পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার বিস্তৃত এ মেলা আয়াতন ও পরিধিতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের আরেক বিখ্যাত সাতক্ষীরার গুড়পুকুরিয়ার মেলা থেকেও বৃহৎ।

তথ্য সুত্র বিভিন্ন ওয়েবসাইট

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে